জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

ইউরোপের তীব্র তাপে বাড়ছে ব্যবসার বীমা সুরক্ষার ঘাটতি

ইউরোপজুড়ে একের পর এক তাপপ্রবাহ শুধু জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করছে না, ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপরও তৈরি করছে বড় ধরনের আর্থিক চাপ। বিশেষ করে পর্যটন, আতিথেয়তা, পরিবহন, উৎপাদন ও খাদ্যসম্পর্কিত খাতগুলোতে বিক্রি কমে যাওয়া, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বাড়ছে। অথচ এই ধরনের ক্ষতির বড় একটি অংশ প্রচলিত ব্যবসায়িক বিঘ্ন বীমার আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।

ইতালির পদুয়া শহরের ক্যাফেগুলোতে সন্ধ্যা ৬টা থেকে ৭টার সময় দীর্ঘদিন ধরে ‘অ্যাপেরিতিভো’ সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দিনের কাজ শেষে মানুষ ক্যাফের বাইরে বসে পানীয় ও হালকা খাবার নিয়ে সময় কাটান। কিন্তু চলতি বছরের পঞ্চম তাপপ্রবাহের সময় সেই পরিচিত চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। প্রচণ্ড গরমে মানুষ বাইরে বসার পরিবর্তে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত অভ্যন্তরীণ স্থানে থাকতে চাইছেন। ফলে সন্ধ্যার ব্যস্ত সময়টিও অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য বিক্রিবিহীন সময়ে পরিণত হচ্ছে।

পদুয়ার আতিথেয়তা ব্যবসায়ীদের সংগঠন এপিপিই পাদোভার সভাপতি ফেদেরিকা লুনির ভাষ্য, গরমের কারণে অ্যাপেরিতিভোর সময় এখন অনেক ক্ষেত্রে আরও পরে শুরু হচ্ছে। ফলে ক্যাফের বাইরের বসার জায়গা, বারান্দা ও উন্মুক্ত অংশগুলো দীর্ঘ সময় খালি পড়ে থাকছে।

শহর ও আশপাশের প্রদেশের প্রায় ৬০০টি আতিথেয়তা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এক জরিপে ৮০ শতাংশের বেশি প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক তাপপ্রবাহের সময় প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছে। লুনির মতে, ব্যবসার আয় ২০ শতাংশ কমে গেলে অনেক প্রতিষ্ঠানের মুনাফার মার্জিন কার্যত নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

বিপুল অর্থনৈতিক ক্ষতি, সীমিত বীমা পরিশোধ

গত গ্রীষ্মের ইউরোপীয় তাপপ্রবাহের অর্থনৈতিক ক্ষতির একটি বড় চিত্র তুলে ধরেছে মুডিসের হিসাব। প্রতিষ্ঠানটির অনুমান অনুযায়ী, ওই তাপপ্রবাহে ইউরোপে অর্থনৈতিক উৎপাদন কমেছে প্রায় ৪৩ বিলিয়ন ইউরো। বিপরীতে এ-সংক্রান্ত বীমা পরিশোধের পরিমাণ ছিল আনুমানিক ৫০ কোটি ইউরো।

এই ব্যবধানই ইউরোপের ক্রমবর্ধমান ‘প্রটেকশন গ্যাপ’-এর চিত্র তুলে ধরে। অর্থাৎ ব্যবসাগুলো যে পরিমাণ আর্থিক ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছে, তার তুলনায় বীমার মাধ্যমে সুরক্ষিত ক্ষতির পরিমাণ অত্যন্ত কম।

চরম তাপের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও জটিল। বন্যা বা ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগে ভবন, যন্ত্রপাতি বা অন্যান্য সম্পদের সরাসরি ক্ষতি সহজে শনাক্ত করা যায়। কিন্তু তাপপ্রবাহের ক্ষতির বড় অংশ আসে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়া, ক্রেতার উপস্থিতি কমে যাওয়া, কর্মীদের উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং অতিরিক্ত শীতলীকরণ ব্যয়ের মতো পরোক্ষ কারণে।

মার্শের জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক ব্যবস্থাপনা পরিচালক সোয়েনজা সুরমিনস্কির মতে, অতিরিক্ত তাপ সাধারণত প্রচলিত বীমার আওতায় থাকা ঝুঁকি নয়। তাপপ্রবাহ বন্যা বা ঝড়ের মতো ব্যাপক অবকাঠামোগত ধ্বংস না ঘটালেও এর ফলে সৃষ্ট আর্থিক ও পরিচালনাগত বিপর্যয় অনেক ক্ষেত্রে সমানভাবে গুরুতর হতে পারে।

ছোট ব্যবসার সুরক্ষাও সীমিত

ইউরোপের বীমা নিয়ন্ত্রক সংস্থার জন্য ২০২৩ সালে প্রায় ৯ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এক জরিপেও সুরক্ষার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়েছিল। জরিপে ২৮ শতাংশ প্রতিষ্ঠান জানিয়েছিল, তাদের সম্পত্তি বীমার সঙ্গে ব্যবসায়িক কার্যক্রম বন্ধ থাকার ক্ষতিপূরণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অন্যদিকে মাত্র ১৭ শতাংশ প্রতিষ্ঠানের এমন বীমা ছিল, যা সম্পদের সরাসরি ক্ষতি না হলেও ধর্মঘটের মতো কারণে ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হলে ক্ষতিপূরণ দিতে পারে।

তাপপ্রবাহের প্রভাব এখন শুধু ক্যাফে বা খুচরা ব্যবসায় সীমাবদ্ধ নেই। অতিরিক্ত গরমে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হচ্ছে, কৃষিপণ্যের উৎপাদন কমছে এবং কারখানাগুলোকে শীতলীকরণে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপমাত্রা বিরাজ করলে কর্মীদের উৎপাদনশীলতাও কমে যেতে পারে।

দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফল প্রকাশের সময় কয়েকটি ইউরোপীয় কোম্পানি গরম আবহাওয়ার নেতিবাচক প্রভাবের কথা জানিয়েছে বা ভবিষ্যতে এমন ঝুঁকির আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে সুইডেনের দোকানসজ্জা সরবরাহকারী আইটিএবি গ্রুপ, ইতালির সিমেন্ট উৎপাদক বুজ্জি এবং ফ্রান্সের অর্থপ্রদানসেবা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ডলাইন।

একক ঝুঁকি নয়, তাপপ্রবাহ এখন ‘যৌথ ঝুঁকি’

বীমা শিল্পের জন্য তাপপ্রবাহের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, এটি প্রায়ই একক দুর্যোগ হিসেবে দেখা যায় না। প্রচণ্ড গরমের সঙ্গে খরা, দাবানল ও পানির সংকট একসঙ্গে দেখা দিতে পারে। ফলে ক্ষতির সুনির্দিষ্ট কারণ নির্ধারণ এবং সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ হিসাব করা কঠিন হয়ে পড়ে।

ইউরোপ বর্তমানে বিশ্বের দ্রুততম উষ্ণায়নশীল মহাদেশ। পরিবেশগত পরিবর্তনের এই প্রবণতা তাপপ্রবাহকে ভবিষ্যতের ব্যবসায়িক ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানে পরিণত করছে। পরিবেশগত ঝুঁকি প্রকাশকারী প্ল্যাটফর্ম সিডিপির তথ্য অনুযায়ী, তাদের পর্যবেক্ষণ করা ৩৫ শতাংশ কোম্পানি তাপপ্রবাহকে ঝুঁকির একটি কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। উৎপাদন, পরিষেবা, অবকাঠামো ও খাদ্যসম্পর্কিত ব্যবসাগুলোর মধ্যে এই উদ্বেগ বিশেষভাবে দেখা যাচ্ছে।

বিদ্যুৎ সরবরাহে সমস্যা হলে সংশ্লিষ্ট শারীরিক ক্ষতির কিছু অংশ বীমার আওতায় আসতে পারে। কিন্তু ব্যবসায়ীদের প্রকৃত ক্ষতি অনেক সময় ঘটে এমন বিক্রিতে, যা আর ফিরে আসে না। বিদ্যুৎ বা অতিরিক্ত গরমের কারণে ক্রেতার উপস্থিতি কমে গেলে কিংবা ব্যবসা কয়েক ঘণ্টা কার্যত অচল থাকলে সেই হারানো আয় প্রচলিত ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থায় পুরোপুরি ধরা পড়ে না।

তাপমাত্রাভিত্তিক বীমায় বাড়ছে আগ্রহ

এই পরিস্থিতিতে বীমা প্রতিষ্ঠানগুলো প্যারামেট্রিক বীমার দিকে নজর দিচ্ছে। এ ধরনের বীমায় কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা তাপমাত্রার সীমা আগে থেকে নির্ধারণ করা থাকে। সেই সীমা অতিক্রম করলে ক্ষতির বিস্তারিত যাচাইয়ের দীর্ঘ প্রক্রিয়া ছাড়াই নির্ধারিত অর্থ পরিশোধ করা যায়।

কৃষি খাতে ইতোমধ্যে এ ধরনের পণ্য ব্যবহারের নজির রয়েছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ফসলের উৎপাদন বা গবাদিপশুর উৎপাদনশীলতা কমে গেলে নির্ধারিত সূচকের ভিত্তিতে বীমা অর্থ পরিশোধ করা যেতে পারে। বীমা শিল্পের বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ভবিষ্যতে পরিবহন, শ্রমিক সুরক্ষা এবং তাপের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য খাতেও এ ধরনের পণ্যের ব্যবহার বাড়তে পারে।

কেবিভি রিসার্চের একটি পূর্বাভাস অনুযায়ী, ইউরোপের প্যারামেট্রিক বীমা বাজার ২০৩১ সালের মধ্যে ৭ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে। ২০২৫ থেকে ২০৩২ সালের মধ্যে এ বাজারের যৌগিক বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ৯ দশমিক ৫ শতাংশ হতে পারে বলে প্রতিষ্ঠানটি ধারণা করছে।

সুইস রি-এর যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডের সরকারি খাতবিষয়ক সমাধান বিভাগের প্রধান এইডান কেরও মনে করেন, তাপপ্রবাহজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় প্যারামেট্রিক বীমার কার্যকর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।

তবে শুধু বীমা দিয়ে এই ঝুঁকি সামাল দেওয়া সম্ভব নয়। ব্যবসাগুলোকে নিজেদের কার্যক্রমও বদলাতে হবে। উন্নত শীতলীকরণ ব্যবস্থা, কর্মস্থলের নকশায় পরিবর্তন, কর্মীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত তাপের সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই—এসব প্রস্তুতি এখন ব্যবসায়িক স্থিতিশীলতার অংশ হয়ে উঠছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ক্ষতি হওয়ার পর তার আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ক্ষতি কমানোর ব্যবস্থা নেওয়াই দীর্ঘমেয়াদে বেশি কার্যকর। ইউরোপে তাপপ্রবাহের ঘনত্ব ও তীব্রতা বাড়তে থাকলে এই প্রস্তুতি শুধু জলবায়ু মোকাবিলার বিষয় থাকবে না; এটি ব্যবসার টিকে থাকার কৌশলেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর