ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলায় বিয়ের আয়োজনের শেষ মুহূর্তে বর ও কনেপক্ষের মধ্যে বিরোধের জেরে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। বিশেষ খাবারে আস্ত খাসি না থাকা নিয়ে শুরু হওয়া কথাকাটাকাটি শেষ পর্যন্ত দুই পরিবারের সম্পর্ককে এমন পর্যায়ে নিয়ে যায় যে, কনের পরিবার বরকে বিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পরে বরপক্ষকে খাবার খাওয়ানোর পর বিয়ের জন্য দেওয়া উপহারসামগ্রী ও স্বর্ণালংকারসহ বাড়ি থেকে বিদায় করা হয়।
সোমবার আখাউড়া উপজেলার ধরখার ইউনিয়নের তোলাতালা গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে বিয়ে ভেঙে যাওয়ার কারণ নিয়ে বর ও কনেপক্ষের বক্তব্যে রয়েছে স্পষ্ট পার্থক্য। কনেপক্ষ বলছে, বিশেষ খাবারে আস্ত খাসি না থাকা এবং এ নিয়ে বরের আচরণই মূল বিরোধের সূত্রপাত। অন্যদিকে বর দাবি করেছেন, আসল সমস্যা ছিল কাবিনের অর্থ নিয়ে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, কসবা উপজেলার নিয়ামতপুর গ্রামের আব্দুল জলিলের ছেলে জুনায়েদ মিয়ার সঙ্গে আখাউড়ার তোলাতালা গ্রামের সফিকুল ইসলাম ভূঁইয়ার মেয়ে রাশেদা আক্তারের বিয়ের দিন নির্ধারিত ছিল ওই দিন। জুনায়েদ জাপানপ্রবাসী। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী দুপুরে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে বরপক্ষের প্রায় ১৫০ জন সদস্যসহ উভয় পরিবারের আত্মীয়স্বজন কনের বাড়িতে উপস্থিত হন।
বরপক্ষ কনের বাড়িতে পৌঁছালে তাঁদের ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। তবে ফুলের তোড়া নিয়েও বর জুনায়েদ অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এরপর অতিথিদের জন্য খাবারের আয়োজন করা হয়। খাওয়াদাওয়া শেষে বর, তাঁর ভাই ও চাচার জন্য আলাদাভাবে তিনটি বড় ডালায় বিশেষ খাবার পরিবেশন করা হয়।
সেখানেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটে। বিশেষ খাবারে আস্ত খাসি না থাকায় বর আপত্তি জানান। বিষয়টি নিয়ে কনেপক্ষের সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি শুরু হয়। কনের বাবা সফিকুল ইসলাম বলেন, বিয়ের আগে আস্ত খাসি দেওয়ার বিষয়ে তাঁদের সঙ্গে কোনো আলোচনা বা চুক্তি হয়নি। তিনি বিষয়টি বরের কাছে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি বিয়ের পরের অনুষ্ঠানে আস্ত খাসি খাওয়ানোর কথাও বলেছিলেন।
সফিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেন বরের ভাই। কিন্তু একপর্যায়ে জুনায়েদ তাঁর ভাইকেই বিয়ে করতে বলেন বলে দাবি করেন কনের বাবা। এই কথায় কনের পরিবার ক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। এরপর সফিকুল ইসলাম সিদ্ধান্ত নেন, এমন পরিস্থিতির পর আর তাঁর মেয়েকে ওই যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেবেন না।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হওয়ার আগেই কনেপক্ষ বরপক্ষকে বাড়ি থেকে চলে যেতে বলে। একই সঙ্গে বিয়ের জন্য দেওয়া উপহারসামগ্রী ও স্বর্ণালংকারও তাঁদের ফেরত দেওয়া হয়। অতিথিদের খাবার খাওয়ানোর পর বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন না করেই বরপক্ষকে ফিরে যেতে হয়।
তবে ঘটনার বিষয়ে বরের বক্তব্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। মঙ্গলবার সকালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে জুনায়েদ দাবি করেন, খাবারে আস্ত খাসি না থাকা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়নি। তাঁর দাবি, খাওয়াদাওয়া শেষে কনেপক্ষ পূর্বনির্ধারিত অর্থের তুলনায় ১০ গুণ বেশি কাবিন দাবি করে। তিনি ও তাঁর পরিবার সেই দাবিতে রাজি না হওয়ায় দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটি শুরু হয়। পরে তাঁদের বিয়ের আসর থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এ কারণে একই ঘটনার দুটি ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। কনেপক্ষের বক্তব্যে খাবার ও বরের আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও বরপক্ষের দাবি, কাবিনের অর্থ বাড়ানোর বিষয়টিই ছিল বিরোধের কেন্দ্র। ফলে কোন বিষয়টি বিয়ে ভেঙে যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল, তা নিয়ে এখনো দুই পক্ষের মধ্যে মতৈক্য নেই।
ধরখার ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য আশিক মিয়া জানান, তিনি ঘটনাটি শুনেছেন। স্থানীয়ভাবে তাঁর কাছে যে তথ্য এসেছে, তাতে খাবার নিয়ে বর খারাপ আচরণ ও বেয়াদবি করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ কারণে কনের বাবা বিয়ে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে বরপক্ষকে তাঁদের জিনিসপত্রসহ বাড়ি থেকে চলে যেতে বলা হয়।
বিয়ের মতো একটি পারিবারিক ও সামাজিক আয়োজন শেষ মুহূর্তে বাতিল হওয়ায় ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক কৌতূহলের জন্ম দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকে বিষয়টি নিয়ে নানা মন্তব্য করলেও প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুই পক্ষের বক্তব্যই গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে খাবার নিয়ে বিরোধের দাবি এবং কাবিনের অর্থ বাড়ানোর অভিযোগ—দুই ধরনের বক্তব্য সামনে থাকায় একপক্ষের বর্ণনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও ঘটনার ধারাবাহিকতা বিবেচনা করেই বিষয়টি দেখা প্রয়োজন।









