,

বর্ণবাদবিরোধী সংগ্রামের মহানায়ক নেলসন ম্যান্ডেলার স্মরণে বিশ্ব: শান্তি ও ক্ষমার অনন্য রূপকার

“কেউ জন্মগতভাবে অন্য মানুষকে ঘৃণা করতে শেখে না; মানুষকে যেমন ঘৃণা করতে শেখানো যায়, তেমনি ভালোবাসতেও শেখানো যায়।” — নেলসন ম্যান্ডেলা

মানবসভ্যতার ইতিহাসে এমন কিছু কালজয়ী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব ঘটেছে, যাঁদের জীবন ও কর্ম কেবল একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের সীমানায় আবদ্ধ থাকে না, বরং সমগ্র বিশ্বের শোষিত-বঞ্চিত মানুষের জন্য প্রেরণার চিরন্তন উৎস হয়ে ওঠে। দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা, শান্তিতে নোবেলজয়ী নেলসন রোলিহ্লাহলা ম্যান্ডেলা তাঁদেরই অন্যতম। তিনি ছিলেন বর্ণবাদ, প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে আপসহীন সংগ্রামের এক জীবন্ত প্রতীক। একই সাথে তিনি ছিলেন ক্ষমাশীলতা, উদার মানবিকতা এবং বিশ্বশান্তির এক অনন্য আলোকবর্তিকা।

জন্ম, শৈশব ও সংগ্রামী জীবনের সূচনা

১৯১৮ সালের ১৮ জুলাই দক্ষিণ আফ্রিকার ইস্টার্ন কেপ প্রদেশের এমভেজো গ্রামে এক অভিজাত থেম্বু রাজপরিবারে নেলসন ম্যান্ডেলার জন্ম। রাজকীয় পরিবারে জন্ম নিলেও দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ওপর শ্বেতাঙ্গ সরকারের অমানবিক নির্যাতন ও কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার হরণ তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছিল। প্রতিবছর তাঁর জন্মদিনের এই বিশেষ দিনটি বিশ্বব্যাপী ‘নেলসন ম্যান্ডেলা আন্তর্জাতিক দিবস’ হিসেবে অত্যন্ত মর্যাদার সাথে পালিত হয়। মানবসেবা, বিশ্বশান্তি ও সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতিসংঘ এই দিবসটি ঘোষণা করে।

শিক্ষাজীবনে ম্যান্ডেলা ফোর্ট হেয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ও উইটওয়াটারস্র্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে অত্যন্ত সুনামের সাথে আইন অধ্যয়ন করেন। পড়ালেখা শেষ করে তিনি জোহানেসবার্গে আইনজীবী হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। তবে ব্যক্তিগত বিলাসিতা বা পেশাগত সাফল্য তাঁকে বেঁধে রাখতে পারেনি; দেশের মানুষের স্বাধীনতা, নাগরিক অধিকার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠাই হয়ে ওঠে তাঁর জীবনের প্রধান ব্রত।

রাজনৈতিক উত্থান ও প্রতিরোধ আন্দোলন

১৯৪৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেস (ANC)-এ যোগ দেন। রাজনৈতিক দূরদর্শিতার কারণে তিনি দ্রুতই নেতৃত্বের সারিতে চলে আসেন এবং ১৯৪৪ সালে দলের যুব সংগঠন ‘এএনসি ইয়ুথ লিগ’ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক আফ্রিকান সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ শুরু করেন। আন্দোলনের এক পর্যায়ে অহিংস নীতি থেকে সরে এসে তিনি সশস্ত্র শাখা ‘উমখন্তো উই সিযওয়ে’ (MK)-এর অন্যতম শীর্ষ নেতা হিসেবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগঠিত প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

১৯৫৬ সালে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে ম্যান্ডেলাসহ আরও ১৫০ জন অধিকারকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। দীর্ঘ পাঁচ বছর বিচারিক প্রক্রিয়া চলার পর ১৯৬১ সালে তাঁরা সবাই নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে মুক্তি পান। তবে এই দমন-পীড়ন তাঁর ভেতরের দ্রোহকে আরও বাড়িয়ে দেয়। ১৯৬২ সালে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয় এবং দেশের অভ্যন্তরে নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে ১৯৬৪ সালে ঐতিহাসিক ‘রিভোনিয়া ট্রায়াল’-এর মাধ্যমে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।

দীর্ঘ কারাবাস ও স্বাধীনতার নতুন সূর্য

কারাদণ্ড পাওয়ার পর জীবনের পরবর্তী ২৭টি বছর নেলসন ম্যান্ডেলাকে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি জীবন কাটাতে হয়। এই দীর্ঘ সময়ের অধিকাংশ সময় তিনি অতিবাহিত করেন দক্ষিণ আফ্রিকার কুখ্যাত ও নির্মম ‘রবেন দ্বীপ’ কারাগারে। পরবর্তীতে তাঁকে পোলসমুর কারাগার এবং ভিক্টর ভার্সটার কারাগারেও স্থানান্তরিত করা হয়। বছরের পর বছর নির্জন কারাবাস ও শারীরিক-মানসিক নির্যাতনও তাঁর ইস্পাতকঠিন মনোবল ভাঙতে পারেনি। বরং কারাগারের দেয়াল ভেদ করে তাঁর নাম ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বজুড়ে; তিনি হয়ে ওঠেন নিপীড়িত মানুষের আশা, সাহস ও আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের এক অদম্য প্রতীক।

বিশ্বজনীন তীব্র চাপ এবং অভ্যন্তরীণ আন্দোলনের মুখে অবশেষে ১৯৯০ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন দক্ষিণ আফ্রিকা সরকারের প্রেসিডেন্ট এফ. ডব্লিউ. ডি. ক্লার্কের নির্দেশে তিনি সসম্মানে মুক্তি লাভ করেন। কারামুক্তির পর তিনি কোনো ধরনের প্রতিশোধের পথ বেছে নেননি। তিনি শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে ঐতিহাসিক শান্তি আলোচনা শুরু করেন, যা দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে কয়েক দশকের পুরোনো প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদী শাসনের চিরতরে অবসান ঘটায়। এই যুগান্তকারী অবদানের জন্য ১৯৯৩ সালে নেলসন ম্যান্ডেলা এবং এফ. ডব্লিউ. ডি. ক্লার্ককে যৌথভাবে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করা হয়।

প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি ও রাষ্ট্রনায়কোচিত উত্তরাধিকার

১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথমবারের মতো সব বর্ণের মানুষের সম-অংশগ্রহণে একটি ঐতিহাসিক ও অবাধ গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা দেশের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ ও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ১৯৯৪ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তিনি অত্যন্ত সফলভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর শাসনামলে তিনি কোনো রাজনৈতিক প্রতিশোধ নেননি, বরং ‘রেইনবো নেশন’ (রংধনু জাতি) গঠনের ডাক দিয়ে জাতীয় ঐক্য, সমঝোতা ও পুনর্মিলনের এক অনন্য বিশ্বজয়ী দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর ৯৫ বছর বয়সে জোহানেসবার্গে এই মহান নেতা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে সমগ্র বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে এসেছিল। নেলসন ম্যান্ডেলা আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ, বর্ণবাদবিরোধী আপসহীন সংগ্রাম এবং মানবতার মহান বার্তা আজও পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে ও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে অনুপ্রেরণা জোগায়। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন— প্রকৃত শক্তি ঘৃণায় নয়, ভালোবাসায়; আর প্রকৃত নেতৃত্ব ক্ষমতার দম্ভে নয়, বরং মানুষের হৃদয় জয় করার মধ্যেই নিহিত থাকে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।