জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ১২:৫৩ পিএম

ফরিদপুরে বাড়ির দোরগোড়া থেকে নিখোঁজ হওয়ার দুই দিন পর ইউসুফ ফকির (৪৫) নামের এক পেঁয়াজ ব্যবসায়ীর হাত-পা বাঁধা মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, ইউসুফকে অপহরণ করার পর তার পরিবারের কাছে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল দুর্বৃত্তরা। দাবিকৃত টাকা না পেয়ে অপহরণকারীরা তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে লাশ ফসলি জমিতে ফেলে রেখে যায়।
শনিবার সকাল সাতটার দিকে ফরিদপুর সদর উপজেলার চরমাধবদিয়া ইউনিয়নের রোকমান খার ডাঙ্গী গ্রামের একটি পাটখেত থেকে ওই ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার করে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশ। নিহত ইউসুফ ফকির ওই গ্রামের সেকেন ফকিরের সন্তান। ব্যক্তিজীবনে তিনি দুই মেয়ে ও এক ছেলের জনক ছিলেন এবং স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের পাইকারি ব্যবসার সাথে যুক্ত ছিলেন।
পারিবারিক ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার বিকেলে ইউসুফ ফকির শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থতা বোধ করেন। তিনি তার স্ত্রীকে জানান যে, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করার জন্য তিনি স্থানীয় মমিনখার হাট বাজারের একটি ডিসপেনসারিতে যাচ্ছেন। বাজারের কাজ সম্পন্ন করে সন্ধ্যার দিকে তিনি একটি ইজিবাইকযোগে নিজ বাড়ির সামনে এসে নামেন। তবে বাড়িতে পৌঁছানোর আগেই ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাকে তুলে নিয়ে যায় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইউসুফ ফকিরের শ্বশুর আজিজ খান জানান, যে ইজিবাইকে করে ইউসুফ বাজার থেকে ফিরেছিলেন, তার চালক নিশ্চিত করেছেন যে ইউসুফকে বাড়ির সামনেই নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এরপর বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার দিকে পরিবারের সদস্যরা ইউসুফের মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করলে তিনি কয়েকবার কল কেটে দেন। পরবর্তীতে রাত নয়টার পর থেকে তার মুঠোফোনটি সম্পূর্ণ বন্ধ পাওয়া যায়। সম্ভাব্য সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি করে তার কোনো সন্ধান না পেয়ে, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে ইউসুফের ভাতিজা সাইফুল ফকির ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন।
নিখোঁজের পরদিন অর্থাৎ শুক্রবার বিকেলে ইউসুফের নিজের মুঠোফোন নম্বর থেকেই তার মেয়ের মোবাইলে একটি কল আসে। ফোনে অজ্ঞাত পরিচয় অপহরণকারীরা জানায় যে ইউসুফ তাদের জিম্মিতে রয়েছে। তাকে অক্ষত অবস্থায় ফিরে পেতে হলে ৩০ হাজার টাকা মুক্তিপণ দিতে হবে। কিন্তু দরিদ্র পরিবারের পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সেই টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি।
চরমাধবদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. আলী মদ্দীন ফকির জানান, শনিবার ভোর ছয়টার দিকে স্থানীয় কয়েকজন কৃষক জমিতে পাট কাটতে যান। এ সময় ইউসুফের বসতবাড়ি থেকে আনুমানিক ৩০০ মিটার দূরে একটি পাটখেতের ভেতর তার হাত-পা বাঁধা অবস্থায় মরদেহ পড়ে থাকতে দেখেন তারা। পরে তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন ছুটে আসে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, নিহতের মুখ দিয়ে কীটনাশকের বিষাক্ত ফেনা বের হচ্ছিল এবং মরদেহের পাশেই একটি কীটনাশকের বোতল পড়ে ছিল। স্থানীয়দের ধারণা, হত্যাকাণ্ডটিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বা আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতেই অপরাধীরা বিষ প্রয়োগের নাটক সাজিয়েছে।
তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়া: ঘটনার সংবাদ পেয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে লাশটি উদ্ধার করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে প্রেরণ করে। ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান সংবাদমাধ্যমকে জানান, “হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ উদঘাটন এবং এর সাথে জড়িত আসামিদের শনাক্ত করতে পুলিশ বিভিন্ন দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। মুক্তিপণের কলটির সূত্র ধরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় অপরাধীদের অবস্থান নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। আশা করা যাচ্ছে, খুব দ্রুতই এই হত্যাকাণ্ডের মূল রহস্য উন্মোচিত হবে এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে।”
মন্তব্য