জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ২:৩৪ পিএম

বাংলাদেশি অভিনয় জগতের এক আলোকবর্তিকা, মঞ্চ ও পর্দার জীবন্ত কিংবদন্তি ডলি জহুর জীবনের ৭৩ বসন্তে পদার্পণ করেছেন। ১৯৫৩ সালের ১৭ জুলাই ঢাকার ঐতিহ্যবাহী গ্রিন রোডে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পী গত শুক্রবার (১৭ জুলাই) জীবনের আরও একটি বছর পেরিয়ে এক অন্যরকম মাইলফলকে এসে দাঁড়িয়েছেন। আগামী বছরই তিনি পূর্ণ করতে যাচ্ছেন তাঁর অভিনয় জীবনের গৌরবময় ৫০ বছর। দীর্ঘ এই পথচলায় ডলি জহুর কেবল নিজেকেই সমৃদ্ধ করেননি, বরং দেশের নাটক ও চলচ্চিত্রের আঙিনাকে করে তুলেছেন অনন্য।
Table of Contents
ঢাকার গ্রিন রোডে ডলি জহুরের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। কৈশোর ও তারুণ্যের সোনালী দিনগুলো কেটেছে এই এলাকাতেই। শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগী ডলি জহুর দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগ থেকে উচ্চশিক্ষা লাভ করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকানোর আগেই সংস্কৃতির এক অমোঘ টান অনুভব করেছিলেন তিনি। সেই টানের সূত্র ধরেই সত্তরের দশকে মঞ্চ নাটকের মাধ্যমে তাঁর অভিনয় জীবনের সূচনা ঘটে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। মঞ্চ থেকে টেলিভিশন, রেডিও এবং পরবর্তীতে রূপালি পর্দায় নিজের অভিনয় প্রতিভার আলো ছড়িয়েছেন তিনি।
১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে অভিনয় জীবন শুরু করলেও চলচ্চিত্রে তাঁর অভিষেক ঘটে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে। ১৯৯২ সালে প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস অবলম্বনে এবং মোস্তাফিজুর রহমান পরিচালিত ‘শঙ্খনীল কারাগার’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে বড় পর্দায় পা রাখেন তিনি। প্রথম চলচ্চিত্রে একজন মধ্যবিত্ত পরিবারের মায়ের চরিত্রে তাঁর অনবদ্য ও সংবেদনশীল অভিনয় দর্শক ও সমালোচকদের ভূয়সী প্রশংসা কুড়ায়। এই চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে প্রথমবারের মতো জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ভূষিত হন।
পরবর্তীতে ২০০৬ সালে প্রখ্যাত নির্মাতা কাজী মোরশেদের ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে এক অনবদ্য পারফরম্যান্সের জন্য তিনি আবারও জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেছেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক’ এবং ‘আজীবন সম্মাননা’।
ব্যক্তিগত জীবনে ১৯৭৬ সালে ডলি জহুর অভিনেতা জহুরুল ইসলামের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তবে প্রায় দুই দশক আগে প্রিয় জীবনসঙ্গী জহুরুল ইসলাম তাঁকে একা করে না ফেরার দেশে চলে যান। তাঁদের একমাত্র সন্তান রিয়াসাত বর্তমানে সপরিবারে অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
সন্তান ও নাতি-নাতনিরা দূর প্রবাসে থাকলেও ডলি জহুর একাকীত্বকে জয় করেছেন দেশের মানুষের ভালোবাসায়। ছেলে রিয়াসাত বারবার মাকে অস্ট্রেলিয়ার স্থায়ী হওয়ার অনুরোধ করলেও দেশের মাটি, মানুষ এবং অভিনয়ের প্রতি গভীর মায়া ও ভালোবাসার কারণে তিনি দেশেই থেকে গেছেন। নিজের একাকীত্ব ও দেশের প্রতি টান নিয়ে এই কিংবদন্তি আবেগঘন কণ্ঠে বলেন:
“জন্মদিনকে ঘিরে আসলে কোনো বিশেষ পরিকল্পনা নেই। জহুর তো সেই দুই দশক আগে আমাকে একা করে চলে গেল। প্রতি মুহূর্তে তাকে ভীষণ মিস করি। একমাত্র ছেলে অস্ট্রেলিয়া থাকে, প্রতিনিয়তই বলে ওর কাছে চলে যেতে। কিন্তু দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি, অভিনয়ের প্রতি, অভিনয় অঙ্গনের মানুষদের প্রতি এতো মায়া, এতো ভালোবাসা রেখে কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। এখনো অভিনয় করে যেতে পারছি এটাই সবচেয়ে বড় কথা।”
ডলি জহুর অভিনীত অসংখ্য চলচ্চিত্র ও নাটকের মধ্যে বেশ কিছু সৃষ্টি ঢাকাই চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। তাঁর অভিনীত উল্লেখযোগ্য সিনেমাগুলোর একটি তালিকা নিচে দেওয়া হলো:
শঙ্খনীল কারাগার (১৯৯২) – প্রথম চলচ্চিত্র এবং প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রাপ্তি।
আগুনের পরশমণি (১৯৯৪) – মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত নন্দিত চলচ্চিত্র।
স্বপ্নের ঠিকানা (১৯৯৫) – বাণিজ্যিক ধারার সফল চলচ্চিত্র।
দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬) – কিশোর চলচ্চিত্র হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয়।
বিচার হবে (১৯৯৬) ও আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭) – পারিবারিক ও রোমান্টিক ঘরানার সিনেমা।
সন্তান যখন শত্রু ও মায়ের কসম – আবেগঘন পারিবারিক গল্প।
নিরন্তর (২০০৬) ও দারুচিনি দ্বীপ (২০০৭) – সমাদৃত সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্র।
ঘানি (২০০৬) – দ্বিতীয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেওয়া চলচ্চিত্র।
বয়সের ফ্রেমে জীবনকে বন্দি না রেখে ৭৩ বছর বয়সেও ডলি জহুর অভিনয়ে সমানভাবে নিয়মিত। দর্শক এখনো টেলিভিশনের পর্দায় তাঁর উপস্থিতি দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করেন। সম্প্রতি তিনি সমসাময়িক দুই গুণী শিল্পী দিলারা জামান ও আবুল হায়াতের সঙ্গে ‘দাদী ভয়ংকর’ নামের একটি বিশেষ নাটকে অভিনয় করেছেন, যা পরিচালনা করেছেন তরুণ নির্মাতা রাহাত কবির।
জন্মদিনের এই বিশেষ ক্ষণে ভক্ত-অনুরাগী ও দেশবাসীর কাছে সুস্থতার দোয়া চেয়েছেন এই গুণী শিল্পী, যেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয়ের মাধ্যমে মানুষকে আনন্দ ও অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যেতে পারেন।
মন্তব্য