ববি হাজ্জাজের চিঠিতে ঢাবি শিক্ষককে অপসারণের চেষ্টা

ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর-আদাবর-শ্যামলী) আসনের সংসদ সদস্য এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) নিয়ে একটি বিতর্কিত বক্তব্য প্রদান করে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। এই রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার মধ্যেই এবার তাঁর নিজ নির্বাচনী এলাকার একটি বেসরকারি কলেজের গভর্নিং বডির সভাপতির পদ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন কর্মরত অধ্যাপক ও শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়ার জন্য জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। একই সাথে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর ওই আপত্তিকর বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ অবাঞ্ছিত বা বর্জন করার ঘোষণা দিয়েছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

আজ শুক্রবার (২৯ মে) সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী টিএসসি সংলগ্ন রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও প্রতিবাদী মানববন্ধন কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। উক্ত প্রতিবাদী মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে উপস্থিত ছাত্রনেতারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করার অপরাধে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আনুষ্ঠানিকভাবে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন। এ সময় বক্তারা প্রতিমন্ত্রীর এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন বক্তব্যের তীব্র নিন্দা জানান এবং অবিলম্বে তাঁর এই বক্তব্য প্রত্যাহারের দাবি উত্থাপন করেন।

ডিমান্ড অর্ডার লেটার ও ঢাবি শিক্ষককে অপসারণের চেষ্টা

নথি ও নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, ববি হাজ্জাজের নিজ নির্বাচনী এলাকা ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘ঢাকা স্টেট কলেজ’। এই কলেজের গভর্নিং বডির বা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির দায়িত্বে বর্তমানে সুনামের সঙ্গে নিয়োজিত আছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অত্যন্ত সুপরিচিত শিক্ষক ও অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমান। কিন্তু ঢাবি শিক্ষক সৈয়দ তানভীর রহমানকে উক্ত পরিচালনা পর্ষদের সভাপতির পদ থেকে অনতিবিলম্বে সরিয়ে দিয়ে নতুন আরেকজন ব্যক্তিকে সেই পদে স্থলাভিষিক্ত বা নিয়োগ করার জন্য সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) বরাবর একটি বিশেষ ডিমান্ড অর্ডার লেটার বা আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) পাঠিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। এই চিঠিটি পাঠাতে তিনি সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর সরকারি প্যাড এবং নিজের দাপ্তরিক স্বাক্ষর ব্যবহার করেছেন।

চিঠির মূল বিষয় ও শিক্ষকদের অসন্তোষ

মনোনয়ন ও শিক্ষক সমাজের প্রতিক্রিয়া:

  • মনোনীত ব্যক্তি: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সৈয়দ তানভীর রহমানকে সভাপতির পদ থেকে অপসারণ করে সেই শূন্য পদে একজন পেশাদার আইনজীবীকে নতুন সভাপতি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত বা দায়িত্ব অর্পণ করতে চাচ্ছেন প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

  • প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার: উপাচার্য বরাবর প্রেরিত সেই দাপ্তরিক চিঠিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে, “আমার নির্বাচনী এলাকা-১৮৬, ঢাকা-১৩ (মোহাম্মদপুর-আদাবর-শেরেবাংলানগর) এ অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এই সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক একাডেমিক পরিবেশ রক্ষা ও সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার স্বার্থে একজন শিক্ষানুরাগী ও উপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া প্রয়োজন। সেই প্রেক্ষিতে অ্যাডভোকেট আখতারুজ্জামান নামের এই বিশিষ্ট ব্যক্তিকে ঢাকা স্টেট কলেজের গভর্নিং বডিতে সভাপতি হিসেবে চূড়ান্ত মনোনয়ন ও অনুমোদন দানের জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ করছি।”

  • শিক্ষকদের ক্ষোভ: সম্প্রতি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য দপ্তরে পাঠানো প্রতিমন্ত্রীর এই দাপ্তরিক চিঠির একটি অনুলিপি দেশের অন্যতম প্রধান শিক্ষাবিষয়ক সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস’-এর হাতে এসেছে। একজন যোগ্য ও কর্মরত বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষককে সরিয়ে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় একজন আইনজীবীকে কলেজের সভাপতি করার এই আকস্মিক ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাধারণ শিক্ষকদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ, অসন্তোষ ও অসন্তুষ্টির সৃষ্টি হয়েছে।

শেষ পরিস্থিতি ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

চিঠির এই ভাষা এবং একজন ঢাবি শিক্ষককে কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া college পরিচালনা পর্ষদ থেকে বাদ দেওয়ার এই একতরফা প্রক্রিয়াকে শিক্ষাক্ষেত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবিদেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির একাধিক সদস্য এবং সাধারণ শিক্ষকেরা প্রতিমন্ত্রীর এই বৈষম্যমূলক ও সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন ফোরামে তীব্র ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমাজ মনে করছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে দেওয়া প্রতিমন্ত্রীর সাম্প্রতিক বিতর্কিত বক্তব্যের সঙ্গে এই অপসারণ চেষ্টার একটি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মনস্তাত্ত্বিক যোগসূত্র রয়েছে। তবে এই চিঠির বিষয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বা অভিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে নতুন করে আর কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা ব্যাখ্যা গণমাধ্যমে দেওয়া হয়নি।