বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম: সংস্কার বিলম্বিত ও মাঠ কমিটির নতুন পরিকল্পনা

দেশের ফুটবলের মক্কা খ্যাত বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে পেশাদার ফুটবল লিগ ফেরার অপেক্ষা আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে চলা এই সংস্কার কাজের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি মাঠ পরিদর্শন শেষে জানানো হয়েছে, আগামী তিন মাসের মধ্যে এখানে কোনো খেলা আয়োজন করা সম্ভব নয়। ফলে ঘরোয়া ফুটবলের ক্লাবগুলোকে আরও একটি মৌসুমের বড় অংশ ঢাকার বাইরে কাটাতে হতে পারে।

মাঠ সংস্কারের বর্তমান অবস্থা ও নতুন সময়সীমা

২০২০ সালে করোনা মহামারি শুরুর পর থেকে এই স্টেডিয়ামের সংস্কার কাজ শুরু হয়। দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও লিগ পর্যায়ের ফুটবল ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) নবগঠিত মাঠ কমিটি বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়াম পরিদর্শন করে বর্তমান পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছে। কমিটির চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান কাজের গতি ও টেকনিক্যাল প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় ২০২৬ সালের ২০ আগস্টের আগে মাঠটি খেলার উপযোগী হবে না।

বর্তমানে মাঠের উপরিভাগের লেয়ার ঢালাইয়ের কাজ চলছে। মাটির গুণাগুণ বৃদ্ধি ও ঘাস রোপণের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অবলম্বন করা হচ্ছে। মাঠের উর্বরতা বৃদ্ধিতে ইউরিয়া সার ব্যবহার এবং পরীক্ষামূলকভাবে দুই প্রজাতির ঘাস চাষ করা হচ্ছে। ২৫ দিন ধরে ঘাসের নমুনার স্থায়িত্ব ও খেলার উপযোগীতা পরীক্ষা করার পর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা

নতুন সংস্কার পরিকল্পনায় মাঠের জলনিষ্কাশন বা ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এর আগে সামান্য বৃষ্টিতেই মাঠের পানি সরতে প্রায় ২০ থেকে ২৫ মিনিট সময় লাগত, যা আন্তর্জাতিক মানের জন্য প্রতিবন্ধকতা ছিল। আধুনিকায়নের ফলে এই সময় কমিয়ে ১০ থেকে ১২ মিনিটে নামিয়ে আনা হচ্ছে।

এছাড়া মাঠের বিশুদ্ধতা বজায় রাখতে ‘আগাছা’ বা ভিন্ন প্রজাতির ঘাস সংক্রমণ রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মাঠের চারপাশের ঘাস যেন বাতাসে উড়ে এসে মূল খেলার মাঠে না পড়ে, সেদিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। বাফুফে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের তথ্যমতে, এবারের সংস্কারে টেকসই ঘাস ও মাটির মিশ্রণ নিশ্চিত করা হচ্ছে।

বাফুফে মাঠ কমিটির সদস্য তালিকা

২০২৪ সালের অক্টোবরে বাফুফের নির্বাচনের পর দীর্ঘ ১৯ মাস বিরতিতে নতুন মাঠ কমিটি গঠন করা হয়েছে। ৯ সদস্য বিশিষ্ট এই কমিটির বর্তমান কাঠামো নিচে দেওয়া হলো:

পদের নামনামপদমর্যাদা/পরিচয়
চেয়ারম্যানইকবাল হোসেনসদস্য, বাফুফে
সদস্যতাবিথ আউয়ালসভাপতি, বাফুফে
সদস্যমাহিদ উদ্দিন আহমেদ সেলিমসদস্য, বাফুফে
সদস্যমঞ্জুরুল আলম দুলালসদস্য, বাফুফে
সদস্যহান্নান মিয়া হান্নুসদস্য, বাফুফে (গাজীপুর)
সদস্যমোবারক হোসেনসদস্য, বাফুফে
সদস্যআনোয়ার হোসেন আনুসদস্য, বাফুফে
সদস্যমোতাহার হোসেনসদস্য, বাফুফে
সদস্যহাফসা রহমান মৌরীসদস্য, বাফুফে

ক্লাবগুলোর সংকট ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা

ঢাকা স্টেডিয়ামের অনুপস্থিতিতে দেশের শীর্ষ ক্লাবগুলো বিশেষ করে মোহামেডান ও আবাহনীর মতো ঐতিহ্যবাহী দলগুলো চরম আর্থিক ও কৌশলগত সংকটে পড়েছে। আন্তর্জাতিক ম্যাচগুলো এই মাঠে মাঝেমধ্যে অনুষ্ঠিত হলেও, ঘরোয়া লিগের ক্লাবগুলোকে ঢাকার বাইরে বিভিন্ন ভেন্যুতে গিয়ে খেলতে হচ্ছে। এতে যাতায়াত ও আবাসন বাবদ দলগুলোর বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় হচ্ছে।

মাঠ কমিটির চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, মাঠের মোট সংস্কার ব্যয় সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নথি যাচাই সাপেক্ষে পরে জানানো হবে। তবে সংস্কারের কাজ শেষ হওয়ার পর নিয়মিত লিগ ম্যাচ এখানে আয়োজন করা হবে কি না, সে বিষয়ে বাফুফের পক্ষ থেকে এখনো চূড়ান্ত নিশ্চয়তা মেলেনি। অন্যদিকে, ক্লাবগুলো ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে লিগের ম্যাচ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে বাফুফের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে এবং সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। ফুটবল প্রেমীদের প্রত্যাশা, আগস্টের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হলে দেশের ফুটবলে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসবে।