বঙ্গোপসাগরের উত্তাল ঢেউ আর বৈরী আবহাওয়ার শিকার হয়ে বরগুনার পাথরঘাটার মাছ ধরার ট্রলার ‘এফবি বরকত’ ডুবির ঘটনায় দীর্ঘ ২২ ঘণ্টা পর পাঁচ জেলের প্রাণহীন দেহ উদ্ধার করা হয়েছে। মঙ্গলবার গভীর সমুদ্র থেকে স্থানীয় উদ্ধারকারী দলের সহায়তায় তাদের মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়। এই মর্মান্তিক ঘটনায় উপকূলজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গত সোমবার দুপুরে সাগরে হঠাৎ আবহাওয়া চরম খারাপ রূপ ধারণ করলে প্রচণ্ড ঢেউয়ের মুখে পড়ে ট্রলারটি ডুবে যায়। দুর্ঘটনা কবলিত ওই ট্রলারে মোট ১৩ জন জেলে ছিলেন। ঘটনার পরপরই আশপাশে থাকা অন্য জেলের সহায়তায় আটজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নিখোঁজ ছিলেন বাকি পাঁচজন। নিখোঁজদের সন্ধানে তাৎক্ষণিকভাবে জেলা মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির পক্ষ থেকে সমুদ্রে আরেকটি উদ্ধারকারী ট্রলার পাঠানো হয়। দীর্ঘ তল্লাশি অভিযান শেষে মঙ্গলবার গভীর সমুদ্র থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করা সম্ভব হয়।
নিহত ও নিখোঁজ জেলেদের বাড়ি বরগুনার পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায়। আকস্মিক এই ট্রলারডুবিতে নিহত পাঁচ জেলে হলেন—নুর আলম (৩৭), কাওসার (৩০), সাইকুল (৩৩), ইব্রাহিম (২৮) এবং বেল্লাল (২২)। প্রিয়জনদের এমন আকস্মিক মৃত্যুর খবরে পাথরঘাটার স্বজনদের আহাজারিতে বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। জীবিকার তাগিদে সমুদ্রে গিয়ে এমন পরিণতি মেনে নিতে পারছেন না নিহতের পরিবারগুলো।
ট্রলারটির মালিক ও একই সঙ্গে মাঝি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বাদল মোল্লা জানান, গভীর সমুদ্র থেকে উদ্ধার করা মরদেহগুলো নিয়ে একটি মাছ ধরার ট্রলার বর্তমানে উপকূলের দিকে ফিরছে। আবহাওয়া প্রতিকূল থাকায় পাথরঘাটায় পৌঁছাতে তাদের নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি অর্থাৎ প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগতে পারে।
দুর্ঘটনার ভয়াবহতার বর্ণনা দিয়ে বেঁচে ফেরা জেলে ও ট্রলারের বাবুর্চি ইউনুস মোল্লা জানান, সোমবার সাগরে তীব্র ঝড়-বৃষ্টি ও তুফান বইছিল। সমুদ্রে জাল ফেলার প্রস্তুতি শেষ করে ক্লান্ত কয়েকজন জেলে ট্রলারের ব্রিজের ভেতরে বিশ্রামের জন্য ঘুমাচ্ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রকৃতির ভয়াল রূপ এবং একটি বিশাল ঢেউয়ের আঘাতে মুহূর্তের মধ্যে ট্রলারটি উল্টে যায়। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা সাগরে ভেসে থাকার পর অন্য একটি ট্রলারের জেলের সহায়তায় আটজন সাঁতরে প্রাণে রক্ষা পান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে আটকা পড়ে প্রাণ হারাতে হয় বাকি পাঁচজনকে।
এদিকে দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পর স্থানীয় প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তৎপর হয়ে ওঠে। পাথরঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ আব্দুল আলীম প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে বাদুরতলা এলাকায় অবস্থান নেন। তিনি জানান, পাঁচ জেলের মরদেহ উদ্ধারের খবর তাদের কাছে এসেছে। মরদেহগুলো তীরে পৌঁছানোর পর পুলিশ সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি এবং পরিবারের কাছে হস্তান্তরসহ পরবর্তী সব আইনগত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকার প্রধান উৎস যে সমুদ্র, সেই সমুদ্রই অনেক সময় জেলের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়, যা এই মর্মান্তিক ঘটনায় আবারও প্রমাণিত হলো।









