জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

রূপালি গিটারের জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু: সুরের ভুবনে এক অমলিন নক্ষত্র

কখনো কখনো কিছু শিল্পী দৈহিক সীমানা পেরিয়ে যান, কিন্তু তাঁদের কণ্ঠ, সুর আর কালজয়ী সৃষ্টির ভেতর দিয়ে তাঁরা চিরকাল থেকে যান ভক্তদের হৃদয়ে। বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে আইয়ুব বাচ্চু তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যাঁর রূপালি গিটারের ঝংকার কয়েক প্রজন্মের শ্রোতার হৃদয়ে আজও সমানভাবে অনুরণিত হয়।

জন্ম ও সংগীতের সূচনা আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম ১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট বন্দরনগরী চট্টগ্রামে। সেখানকার সংগীতমুখর পরিবেশেই তাঁর বেড়ে ওঠা। কৈশোরেই গিটারের সুরের প্রতি এক অদম্য টান অনুভব করেন তিনি। গিটার হাতে তাঁর যে যাত্রার সূচনা হয়েছিল, তা একসময় তাঁকে বাংলাদেশের রক ও ব্যান্ড সঙ্গীতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রবাদপুরুষে পরিণত করে। তাঁর কণ্ঠের স্বতন্ত্রতা, গিটারের অসাধারণ ব্যবহার, মঞ্চে প্রাণবন্ত পরিবেশনা এবং সুর সৃষ্টির অনন্য ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দিয়েছিল।

সোলস থেকে এলআরবি: এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের ইতিহাসে ‘সোলস’ এবং পরবর্তীকালে ‘এলআরবি’ (LRB)-র সঙ্গে আইয়ুব বাচ্চুর নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। সোলসে দীর্ঘ সময় প্রধান গিটারবাদক ও গায়ক হিসেবে কাজ করার পর, ১৯৯১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন তাঁর ড্রিম ব্যান্ড ‘লিটল রিভার ব্যান্ড’, যা পরবর্তীতে ‘লাভ রান্স ব্লাইন্ড’ (LRB) নামে পরিচিতি লাভ করে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই ব্যান্ডটি বাংলা রকের জগতে এক নতুন যুগের সূচনা করে এবং বাংলাদেশের ব্যান্ড সঙ্গীতের এক অনন্য ব্র্যান্ডে পরিণত হয়।

সংগীতের বহুমাত্রিক রূপকার আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন একাধারে গায়ক, অসামান্য গিটারবাদক, সুরকার, গীতিকার ও সংগীত পরিচালক। ব্যান্ড সঙ্গীতকে তিনি কেবল বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি; তাঁর সৃষ্টিতে প্রেম, বিরহ, নিঃসঙ্গতা, জীবনসংগ্রাম ও নাগরিক মানুষের অন্তহীন আবেগ পেয়েছে গভীর শিল্পরূপ। ‘সেই তুমি কেন এত অচেনা হলে’, ‘চলো বদলে যাই’, ‘হাসতে দেখো গাইতে দেখো’, ‘রুপালি গিটার’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘একদিন ঘুম ভাঙা শহরে’—এমন অসংখ্য কালজয়ী গান তাঁর কণ্ঠ ও সুরে হয়ে উঠেছে বাংলা সংগীতের অমূল্য সম্পদ।

ইলেকট্রিক গিটারের জাদুকর বাংলা ব্যান্ড সংগী্যে মেলোডিয়াস লিরিক্সের পাশাপাশি প্রোগ্রেসিভ ও ব্লুজ-রক ঘরানার ইলেকট্রিক গিটারকে জনপ্রিয় করে তোলার ক্ষেত্রে আইয়ুব বাচ্চুর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁর দীর্ঘ গিটার সোলো, মঞ্চের দাপুটে ও শক্তিমান পরিবেশনা এবং কণ্ঠের গভীর আবেগ তাঁকে তরুণ প্রজন্মের কাছে এক অনন্য আইকনে পরিণত করেছিল। ব্যান্ড সঙ্গীতের বাইরেও বহু একক অ্যালবাম এবং চলচ্চিত্রের গানে তিনি অসামান্য স্বাক্ষর রেখেছেন, যা চলচ্চিত্রের গণ্ডি পেরিয়ে আমজনতার মুখে মুখে ফিরেছে।

শেষ মঞ্চস্মৃতি ও মহাপ্রস্থান সংগীতের প্রতি তাঁর নিষ্ঠা ও নিরলস সাধনা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ২০১৮ সালের ১৬ অক্টোবর রংপুর জিলা স্কুল মাঠে আয়োজিত একটি কনসার্টে তিনি শেষবারের মতো সুরের মায়া ছড়িয়েছিলেন। তার ঠিক দুই দিন পর, ১৮ অক্টোবর ২০১৮ সালে, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে ঢাকার বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই কালজয়ী শিল্পী। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে স্তব্ধ হয়ে যায় পুরো দেশের সংগীতাঙ্গন।

আইয়ুব বাচ্চু আজ শারীরিকভাবে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু কোনো এক নির্জন রাতে যখন বাজে ‘সেই তুমি’ কিংবা কোনো তরুণের হাতে যখন ঝংকৃত হয় একটি গিটার, তখন মনে হয় রূপালি গিটারের এই জাদুকর বেঁচে আছেন তাঁরই সৃষ্টিতে—অনন্তকাল ধরে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর