জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

প্রথম বিবাহবার্ষিকীতেই সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ গেল লিজার

প্রথম বিবাহবার্ষিকীর দিনটি স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে বাবার বাড়িতে যাওয়ার কথা ছিল ২০ বছর বয়সী লিজা আক্তারের। দিনটি হওয়ার কথা ছিল আনন্দ, পারিবারিক মিলন আর নতুন দাম্পত্য জীবনের স্মৃতিচারণে ভরা। কিন্তু বাবার বাড়ির উদ্দেশে সেই যাত্রাই শেষ পর্যন্ত তাঁর জীবনের শেষ পথচলায় পরিণত হলো। রংপুরের পীরগাছায় দ্রুতগতির একটি ট্রাকের চাপায় নিহত হয়েছেন লিজা। গুরুতর আহত তাঁর স্বামী শামীম মিয়া বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

শনিবার রাত ৮টার দিকে পীরগাছা উপজেলার সাতদরগাহ-রংপুর সড়কের কালীস্থান এলাকায় এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরপরই এলাকায় শোকের আবহ তৈরি হয়। বিশেষ করে বিবাহবার্ষিকীর দিনেই লিজার এমন মৃত্যু তাঁর পরিবার, স্বজন ও পরিচিতজনদের মধ্যে গভীর বেদনার সৃষ্টি করেছে।

নিহত লিজা আক্তার উপজেলার গুয়াবাড়ি গ্রামের ব্যবসায়ী লাভলু মিয়ার মেয়ে। তাঁর স্বামী শামীম মিয়া অন্নদানগর ইউনিয়নের বামনসর্দার গ্রামের বাসিন্দা। স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সন্ধ্যায় স্বামীর সঙ্গে মোটরসাইকেলে করে বাবার বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন লিজা। তাঁদের এই স্বাভাবিক পারিবারিক যাত্রা যে এত দ্রুত করুণ পরিণতি বয়ে আনবে, তা কেউ কল্পনাও করেননি।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, সাতদরগাহ-রংপুর সড়কের কালীস্থান এলাকায় পৌঁছানোর পর বিপরীত দিক থেকে আসা একটি দ্রুতগতির ট্রাক মোটরসাইকেলটিকে চাপা দেয়। সংঘর্ষের ধাক্কায় মোটরসাইকেলটি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং লিজা ও শামীম দুজনই গুরুতর আহত হন।

দুর্ঘটনার শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। স্থানীয়রা আহত দম্পতিকে উদ্ধার করে চিকিৎসার জন্য পীরগাছা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দিকে নিয়ে যান। কিন্তু হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই লিজা আক্তারের মৃত্যু হয়। তাঁর স্বামী শামীম মিয়ার অবস্থাও গুরুতর হওয়ায় তাঁকে পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁর শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

দুর্ঘটনার পর স্থানীয়রা ট্রাকটি আটক করতে সক্ষম হলেও চালক ও তাঁর সহকারী ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যান। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ট্রাকটি নিজেদের হেফাজতে নেয়। পালিয়ে যাওয়া চালক ও সহকারীকে আটকের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে বলে জানা গেছে।

পীরগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সেলিম মালিক জানান, দুর্ঘটনার পর ট্রাকটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

লিজার মৃত্যু তাঁর পরিবারের জন্য শুধু একজন প্রিয়জনকে হারানোর ঘটনা নয়; এটি তাঁদের কাছে আনন্দের একটি দিনকে চিরস্থায়ী শোকের স্মৃতিতে পরিণত করেছে। প্রথম বিবাহবার্ষিকীতে স্বামীর সঙ্গে বাবার বাড়িতে যাওয়ার যে পরিকল্পনা ছিল, তা আর পূরণ হলো না। মাত্র ২০ বছর বয়সেই থেমে গেল তাঁর দাম্পত্য জীবনের পথচলা।

এ ধরনের দুর্ঘটনা আবারও সড়কে ভারী যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণ এবং মোটরসাইকেলসহ ছোট যানবাহনের নিরাপত্তার বিষয়টি সামনে এনেছে। বিশেষ করে মুখোমুখি চলাচলের সড়কে দ্রুতগতির ট্রাক ও অন্যান্য ভারী যানবাহনের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। চালকদের নির্ধারিত গতি মেনে চলা, সতর্কতার সঙ্গে যান চালানো এবং সড়কের নিয়ম-কানুন অনুসরণ করা জরুরি।

একই সঙ্গে দুর্ঘটনার পর আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রে দুর্ঘটনার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টায় দ্রুত চিকিৎসা পাওয়া আহত ব্যক্তির জীবন রক্ষায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। স্থানীয় বাসিন্দাদের দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহত দম্পতিকে হাসপাতালে নেওয়ার উদ্যোগটি সেই দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

লিজা আক্তারের মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। স্থানীয়দের মধ্যেও নেমে এসেছে বিষণ্নতা। তাঁরা দুর্ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন। পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

একটি পরিবারের কাছে বিবাহবার্ষিকী সাধারণত ভালোবাসা, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার দিন। কিন্তু লিজার পরিবারকে সেই দিনটিই এখন মনে রাখতে হবে এক অপূরণীয় ক্ষতির দিন হিসেবে। বাবার বাড়ির পথে শুরু হওয়া একটি স্বাভাবিক যাত্রা কয়েক মুহূর্তের মধ্যে কেড়ে নিল তরুণ এক নারীর জীবন এবং তাঁর স্বামীকে পাঠিয়ে দিল হাসপাতালের শয্যায়।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর