খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২০ই জুন ২০২৬, ৮:৬ পিএম

পদ্মা নদীর বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে অবৈধ বালু উত্তোলন ও বালুমহাল নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ঘটনায় গত নয় মাসে সাতজন নিহত হয়েছেন। নাটোরের লালপুর, রাজশাহীর বাঘা, পাবনার ঈশ্বরদী এবং কুষ্টিয়ার দৌলতপুর অংশে বিস্তৃত এই চরাঞ্চলে একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক সহিংসতা ঘটছে বলে স্থানীয় সূত্র ও পুলিশ জানিয়েছে।
সবশেষ ঘটনায় গত মঙ্গলবার (১৬ জুন) লালপুর উপজেলার রাইটার চর এলাকায় পদ্মা নদীতে ভাসমান একটি নৌকা থেকে সাহাবুল ইসলাম (৪৫)-এর গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তিনি পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার সাঁড়া গোপালপুর গ্রামের ইউনুস প্রামাণিকের ছেলে। লালপুর থানার অফিসার ইনচার্জ শফিকুল ইসলাম জানান, ভোরের দিকে নদীর তীরে অবস্থান নিয়ে দুর্বৃত্তরা গুলি চালিয়ে তাঁকে হত্যা করে। ঘটনায় একজন মাছধরাও আহত হয়েছেন এবং তিনি রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্থানীয় কৃষক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা যায়, চরাঞ্চলের বালু ব্যবসা নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘাত চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায় ৯ জুন চরজাজিরা এলাকায় একটি স্পিডবোটে এক তরুণের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধারের ঘটনার পর।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত অন্তত সাতটি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের অক্টোবর–নভেম্বরে তিনটি এবং ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে চারটি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়। নিহতরা বিভিন্ন গোষ্ঠীর সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।
চরাঞ্চলে সক্রিয় বিভিন্ন গোষ্ঠীর তালিকা অনুযায়ী অন্তত ১১টি সশস্ত্র বাহিনী—যেমন কাঁকন বাহিনী, মন্ডল বাহিনী, টুকু বাহিনী, সাঈদ বাহিনী, লালচাঁদ বাহিনী, রাখি বাহিনী, শরীফ কাইগি বাহিনী, রাজ্জাক বাহিনী, চল্লিশ বাহিনী, বাহান্ন বাহিনী এবং সুখচাঁদ-নাহারুল বাহিনী—পুলিশের নজরদারিতে রয়েছে। এর মধ্যে কাঁকন বাহিনী সবচেয়ে প্রভাবশালী বলে স্থানীয় সূত্রগুলো দাবি করেছে।
নিচে সাম্প্রতিক কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো—
| তারিখ | স্থান | ঘটনা | ফলাফল |
|---|---|---|---|
| ২৭ অক্টোবর (গত বছর) | দৌলতপুর সীমান্তবর্তী চর | গুলিবিনিময় | ২ জন নিহত |
| ২৮ অক্টোবর | হবিরচর | লাশ উদ্ধার | ১ জন নিহত |
| ৩ জানুয়ারি | বাঘা উপজেলা | বাড়িতে ঢুকে গুলি | ১ জন নিহত |
| ১৮ মে | কালিদাসখালী চর | সশস্ত্র হামলা | ১ জন নিহত |
| ৯ জুন | চরজাজিরা | স্পিডবোটে লাশ উদ্ধার | ১ জন নিহত |
| ১৬ জুন | রাইটার চর | নৌকা থেকে লাশ উদ্ধার | ১ জন নিহত |
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, এসব হত্যাকাণ্ড মূলত বালুমহাল দখল, চাঁদাবাজি এবং চরাঞ্চলের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হয়েছে। অভিযানে বিভিন্ন সময়ে অস্ত্র, গুলি, দেশীয় অস্ত্র, মোটরসাইকেল, স্পিডবোট ও নগদ অর্থ উদ্ধার করা হয়েছে।
লালপুর থানার সাম্প্রতিক অভিযানের পর ১০টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৭টি পিস্তল, ২৪ রাউন্ড গুলি, দেশীয় অস্ত্র ও যানবাহন উদ্ধার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন যৌথ অভিযানে একাধিক আস্তানা থেকে অস্ত্র ও মাদক উদ্ধার করা হয়েছে।
বাঘা থানার ওসি সেরাজুল হক জানান, “অপারেশন ফাস্ট লাইট” নামের অভিযানে এ পর্যন্ত ২০৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং অস্ত্র উদ্ধার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
পদ্মা চরাঞ্চলে বালুমহালকে কেন্দ্র করে সংঘাতের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, প্রায় দুই দশক ধরে এখানে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে একাধিক গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে। পূর্ববর্তী সময়ে পান্না বাহিনী ও কাঁকন বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে বহু প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছিল বলে স্থানীয়ভাবে উল্লেখ পাওয়া যায়।
পুলিশের রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি খন্দকার মো. শামীম হোসেন জানান, চরাঞ্চলে সংঘটিত সহিংসতা দীর্ঘদিনের সমস্যা এবং দুই রেঞ্জের সমন্বয়ে নজরদারি ও অভিযান চালানো হচ্ছে।
মন্তব্য