,

তীব্র তাপপ্রবাহে বিপর্যস্ত বেলজিয়াম: ১৫ দিনে রেকর্ড ২ হাজার মানুষের মৃত্যু

ইউরোপজুড়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে গ্রীষ্মকালীন আবহাওয়া ক্রমশ চরম রূপ ধারণ করছে। চলমান এই তীব্র দাবদাহে মহাদেশটির জনজীবন সম্পূর্ণ ওলটপালট হয়ে গেছে, যার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব দৃশ্যমান হয়েছে বেলজিয়ামে। চলতি গ্রীষ্মের জুনের শেষভাগ থেকে জুলাইয়ের শুরু পর্যন্ত—মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দেশটিতে প্রায় ২,০০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। অতিরিক্ত গরমজনিত শারীরিক অসুস্থতা এবং তীব্র হিটস্ট্রোকের কারণে এত বিশাল সংখ্যক মানুষ মারা গেছেন বলে দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ নিশ্চিত করেছে।

মৃত্যুর আঞ্চলিক বিস্তার ও স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিবেদন

বেলজিয়ামের শীর্ষস্থানীয় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিয়েনসানো এক জরুরি বিবৃতিতে এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান প্রকাশ করেছে। তাদের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, গত ১৮ জুন থেকে ৩ জুলাই পর্যন্ত সময়সীমার মধ্যে দেশটিতে মৃত্যুর এই ঘটনাগুলো ঘটে।

প্রতিবেদনে বেলজিয়ামের ভৌগোলিক অঞ্চলভিত্তিক মৃত্যুর একটি চিত্র তুলে ধরা হয়েছে:

  • ওয়ালোনিয়া: দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় এই প্রদেশটিতেই সবচেয়ে বেশি মানুষ তীব্র গরমের শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

  • ব্রাসেলস: মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশের রাজধানী ও প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র ব্রাসেলস।

  • ফ্ল্যান্ডার্স: বেলজিয়ামের উত্তরাঞ্চলীয় এই প্রদেশটিতে মৃত্যুর হার তুলনামূলক কম হলেও এটি তালিকার তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ: হঠাৎ করে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অতিরিক্ত বৃদ্ধি পাওয়ায় বিশেষ করে বয়োবৃদ্ধ এবং যারা আগে থেকেই নানাবিধ ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভুগছিলেন, তাদের শরীর এই চরম আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে পারেনি।

ইতিহাসের ভয়াবহতম তাপপ্রবাহের নজির

বেলজিয়ামের স্বাস্থ্য খাতের ইতিহাসে চলমান এই পরিস্থিতিকে একটি অভূতপূর্ব বিপর্যয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। সিয়েনসানো জানিয়েছে, তারা মূলত ২০০০ সাল থেকে দেশে তাপপ্রবাহ ও আবহাওয়া সংক্রান্ত মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান ও রেকর্ড রাখা শুরু করে। গত আড়াই দশকেরও বেশি সময়ের ডেটা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের মতো এত কম সময়ে এত বিপুল পরিমাণ মানুষের মৃত্যু এর আগে কখনোই ঘটেনি।

তীব্র পানিশূন্যতা (ডিহাইড্রেশন), হিট এক্সহাস্টন এবং শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা হঠাৎ বিপজ্জনক মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় কার্ডিওভাসকুলার ও শ্বাসতন্ত্রের রোগাক্রান্ত ব্যক্তিরা দ্রুত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। এর আগে বেলজিয়ামে দাবদাহের কারণে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় নেমে এসেছিল ২০২০ সালে। সে বছর দেশটিতে ১,৫৫৭ জন মানুষ গরমের কারণে মারা গিয়েছিলেন। কিন্তু চলতি বছরের মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানেই মৃতের সংখ্যা ২ হাজার পার হয়ে যাওয়ায় বিগত চার বছরের পুরোনো রেকর্ড ভেঙে এক নতুন ও উদ্বেগজনক মাইলফলক তৈরি হলো।

জলবায়ু সংকট ও ভবিষ্যৎ প্রতিরোধ ব্যবস্থা

পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে ইউরোপের চিরচেনা মৃদু জলবায়ু এখন চরম ভাবাপন্ন হয়ে উঠছে। বেলজিয়ামের মতো দেশগুলোতে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ (এসি) ব্যবস্থার প্রচলন ঐতিহাসিকভাবে কম হওয়ায়, হঠাৎ আসা এমন তীব্র গরম সাধারণ মানুষের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে চিকিৎসকেরা নাগরিকদের জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। বিশেষ করে প্রবীণ, শিশু এবং শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করা ব্যক্তিদের জন্য পর্যাপ্ত পানি পান ও শরীর ঠান্ডা রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সাথে, ভবিষ্যতে এমন চরম আবহাওয়া মোকাবিলা করতে বেলজিয়াম সরকারকে তাদের শহরের অবকাঠামো এবং জনস্বাস্থ্য নীতিতে আমূল পরিবর্তনের আহ্বান জানাচ্ছেন পরিবেশবাদীরা।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।