জি-লাইভ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮ই জুলাই ২০২৬, ১০:৩২ এএম

ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তিকে পাশ কাটিয়ে ইরানে মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিমান হামলা টানা সপ্তম রাতে গড়িয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই চরম উত্তেজনার পারদ এখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন এক যুদ্ধক্ষেত্রের আশঙ্কা তৈরি করেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকম) আজ শনিবার (বাংলাদেশ সময়) ভোরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
সেন্টকম তাদের বার্তায় উল্লেখ করেছে, মার্কিন সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ তথা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরাসরি নির্দেশনায় ইরানে এই বিশেষ সামরিক অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। ইরানের সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা হ্রাস করতেই মার্কিন বাহিনী তাদের এই প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে বলে সেন্টকমের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার রাতের সর্বশেষ মার্কিন বিমান হামলায় ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কৌশলগত প্রদেশ হরমুজগানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রদেশের রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক ডেপুটি গভর্নর ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম ‘ইরনা’-কে জানিয়েছেন, শুক্রবার রাতে প্রদেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় মার্কিন যুদ্ধবিমান থেকে বোমা বর্ষণ করা হয়। এই হামলায় এখন পর্যন্ত ৩ জন নিহত এবং ৮ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে, এই সংঘাতের মধ্যেই ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর অভিজাত শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, শুক্রবার হরমুজ প্রণালিতে ইরানের জলমাইন পেতে রাখা অংশ দিয়ে পারাপারের সময় দু’টি বিদেশি বাণিজ্যিক ট্যাংকার জাহাজ বিস্ফোরিত হয়েছে। তবে মার্কিন সেন্টকম আইআরজিসির এই দাবিকে সম্পূর্ণ ‘ভিত্তিহীন’ ও মনগড়া বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের এই টানা হামলার প্রেক্ষিতে তেহরানের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও চরম হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। ইরান অবিলম্বে এই বিমান হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। অন্যথায় পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন ইরানি কর্মকর্তারা।
শুক্রবার রাতের হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় ওয়াশিংটনকে সতর্কবার্তা দিয়েছেন। এক তাৎক্ষণিক বার্তায় তিনি বলেন:
“যুক্তরাষ্ট্র যদি আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এভাবে একের পর এক হামলা অব্যাহত রাখে, তবে ইরান নিজেকে আর শুধু পাল্টা হামলার (Retaliation) মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না। আমরা এবার পূর্ণমাত্রায় যুদ্ধে নামতে বাধ্য হব। আর যদি ইরান পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ায়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের উপসাগরীয় অঞ্চলের কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই আর সুরক্ষিত থাকবে না।”
চলতি বছরের ৫ জুলাই হরমুজ প্রণালিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের (ইউএই) দুটি বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী। ওয়াশিংটনের দাবি, এই ড্রোন হামলা ছিল দু’দেশের মধ্যকার ‘ইসলামাবাদ সমঝোতা চুক্তি’র স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই ঘটনার পর থেকেই তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যে নতুন করে যুদ্ধংদেহী মনোভাব তৈরি হয়।
এর দুই দিন পর, ৮ জুলাই তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে সমস্ত কূটনৈতিক ও শান্তি আলোচনা সমাপ্তির ঘোষণা দেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষায় বলেছিলেন, “ইরানের সঙ্গে আমাদের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে ইরান ইসলামাবাদ সমঝোতা স্মারকের চরম লঙ্ঘন করেছে। ইরানে ক্ষমতাসীন সরকারের নেতারা অসুস্থ ও নিকৃষ্ট। এমতাবস্থায় তাদের সাথে কোনো ধরণের শান্তিচুক্তি বা আলোচনা করা মানে কেবলই সময় নষ্ট।”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর, গত ১১ জুলাই রাত থেকে মার্কিন সেন্টকম ইরানের বিভিন্ন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ধারাবাহিকভাবে বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করে, যা গতকাল শুক্রবার রাতে সপ্তম দিনের মতো পদার্পণ করল। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না এলে তা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে এক দীর্ঘমেয়াদি ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
মন্তব্য