বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গরম বাড়ার মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় নতুন করে বেড়েছে লোডশেডিং। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি গ্যাসের সংকটও উৎপাদন ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করেছে। সর্বশেষ ভারত থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট এবং দেশের আরএনপিএলের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) বেলা ৩টার বিদ্যুৎ পরিস্থিতির প্রতিবেদনে দেখা যায়, ওই সময় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে উৎপাদন হয়েছে ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট। অর্থাৎ চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে ঘাটতি ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াট। দিনের সর্বোচ্চ চাহিদার তুলনায় ওই সময়ের চাহিদা অন্তত ১ হাজার মেগাওয়াট কম থাকলেও উৎপাদন ঘাটতি ছিল উল্লেখযোগ্য।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) জহুরুল ইসলাম জানান, হঠাৎ করে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। ইউনিটটি দ্রুত সচল করতে মেরামতের কাজ চলছে। এর মধ্যে আরএনপিএলের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়েছে। দুটি ইউনিট একসঙ্গে উৎপাদনের বাইরে চলে যাওয়ায় নতুন করে প্রায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পুরোনো সমস্যাগুলোও রয়ে গেছে।
জাতীয় বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের (এলএনডিসি) তথ্যেও উৎপাদন কমে যাওয়ার চিত্র পাওয়া যায়। গত বুধবার রাত ১১টার দিকে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট থেকে কমে ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে যায়। অর্থাৎ অল্প সময়ের ব্যবধানে কেন্দ্রটির উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়।
কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদনও কমেছে। এক দিন আগে এসব কেন্দ্র থেকে যেখানে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছিল, বুধবার রাতে তা কমে ৪ হাজার ৮৫৭ মেগাওয়াটে দাঁড়ায়। ফলে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।
কারিগরি সমস্যায় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কয়েকটিও বন্ধ রয়েছে। আশুগঞ্জের ৪৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র আগের দিন ৩১৯ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছিল। পরে কারিগরি ত্রুটির কারণে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। ফলে ওই কেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনে আরেকটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে গ্যাসের সংকট। ঢাকা অঞ্চলে গ্যাসের অভাবে অন্তত সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ অথবা কম সক্ষমতায় চলছে। একই কারণে চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ অঞ্চলেও একটি করে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর একাংশ কারিগরি ত্রুটিতে বন্ধ থাকা এবং অন্য কয়েকটি গ্যাসের অভাবে স্বাভাবিক সক্ষমতায় উৎপাদন করতে না পারায় জাতীয় পর্যায়ে চাহিদা ও সরবরাহের ব্যবধান বেড়েছে। গরমের সময়ে বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়লে এই ঘাটতি আরও চাপ তৈরি করতে পারে। তবে বর্তমান প্রতিবেদনে দিনের সর্বোচ্চ চাহিদা বা পরবর্তী সময়ে পরিস্থিতি কতটা বদলেছে, সে বিষয়ে আলাদা তথ্য দেওয়া হয়নি।
এর প্রভাব ইতোমধ্যে ভোগান্তি বাড়িয়েছে সাধারণ গ্রাহকদের। কয়েক সপ্তাহ তুলনামূলকভাবে কম থাকার পর দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও লোডশেডিং তীব্র হয়েছে। শহরাঞ্চলের অনেক এলাকায় দিনে কয়েকবার বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে; কোথাও কোথাও চারবার পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে।
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। কিছু এলাকায় দিনে ৭ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং ফিরে এসেছে। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত মেরামত করে উৎপাদনে ফেরানো এবং গ্যাসসংকটে থাকা কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বড় উৎপাদন সক্ষমতার কেন্দ্রগুলো একযোগে বন্ধ থাকায় যে ঘাটতি তৈরি হয়েছে, সেগুলো সচল না হওয়া পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা থাকছে।








