জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

জ্বালানি সংকটের আশু সমাধান দেখছেন না প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, বললেন ২৯ সালা নাগাদ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে

দেশের শিল্প ও ব্যবসা খাতে চলমান জ্বালানি সংকট আগামী শীত মৌসুমের মধ্যেই অনেকটা স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে নিয়ে আসার আশা করছে সরকার। বড় আকারের অর্থনীতির প্রয়োজন বিবেচনায় নিয়ে ২০২৯ সালের মধ্যে দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।

গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জ্বালানি পরিস্থিতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নতুন বেতন কাঠামো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, রাজস্ব আহরণ এবং অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় আগামী শীতের আগেই দৃশ্যমান অগ্রগতি আনার চেষ্টা চলছে। অতীতে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুত না রাখার কারণে সংকটের প্রভাব আরও তীব্র হয়েছে। ভবিষ্যতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে খাদ্য মজুতের মতো জ্বালানি ও বিদ্যুতের কাঁচামালের ক্ষেত্রেও নির্দিষ্ট পরিমাণ নিরাপদ মজুত রাখার মানদণ্ড তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, দেশে অন্তত তিন মাসের জ্বালানি মজুত রাখার ব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে। একইভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় কাঁচামালও তিন মাসের জন্য মজুত রাখার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। জ্বালানি সরবরাহে কোনো ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে যাতে শিল্প, পরিবহন ও বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত একসঙ্গে বড় ধরনের ঝুঁকিতে না পড়ে, সে লক্ষ্যেই এই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন উৎস অনুসন্ধান ও বিকল্প পরিবহনপথ ব্যবহারের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের সমুদ্রসীমায় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য চলতি বছরের নভেম্বর মাসে দরপত্র আহ্বানের কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা। এ অনুসন্ধান কার্যক্রমে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানিকেও সম্পৃক্ত রাখা হবে। একই সঙ্গে দেশের বিদ্যমান কয়লা সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে। নেট মিটারিং ব্যবস্থার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে শুধু বিদ্যুতের গ্রাহক হিসেবে নয়, উৎপাদক হিসেবেও যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ পর্যন্ত এ ব্যবস্থার আওতায় ৩৬ হাজার আবেদন পাওয়া গেছে। ২০২৯ সালের নভেম্বরের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

অর্থ উপদেষ্টা জানান, সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের কাজও এগিয়ে চলছে। সরকারি চাকরির বেতন কাঠামো পর্যালোচনাসংক্রান্ত কমিটি এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কমিটির প্রতিবেদন সচিব কমিটি পর্যালোচনা করেছে। বিচার বিভাগের বেতন কাঠামো নিয়ে সংশ্লিষ্ট কমিটির কাজও শুরু হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর চূড়ান্ত ঘোষণা এবং বাস্তবায়নের সময় মন্ত্রিসভার বৈঠকে নির্ধারণ করা হবে। এর অর্থায়নে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজন হলে ঋণ নেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও একক কোনো নীতির ওপর নির্ভর না করে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানান উপদেষ্টা। রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির পাশাপাশি উৎপাদন বাড়ানো, জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় করা হচ্ছে। তাঁর মতে, অর্থনীতির বিভিন্ন অংশকে একই সঙ্গে স্থিতিশীল করতে পারলেই দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতির চাপ কমানো সম্ভব হবে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অংশ হিসেবে চলতি অর্থবছরে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে ৪১ লাখ মানুষকে পারিবারিক কার্ডের আওতায় আনার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এই উদ্যোগের মাধ্যমে দারিদ্র্যের হার সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের মাধ্যমে ১২ লাখ কৃষককে সহায়তা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা শিল্পকারখানা পুনরায় চালুর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কর ব্যবস্থাপনায় পাঁচ বছরের পরিকল্পনা এবং বন্ডেড গুদাম ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান উপদেষ্টা।

বন্ধ কারখানাগুলো পুনরায় চালুর জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আইন ও অধ্যাদেশ জারির পর ডিসেম্বরের মধ্যে হস্তান্তরের লক্ষ্যে দরপত্র প্রক্রিয়া চলছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ও মোংলায় নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চল ও রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল আগামী ১৮ মাসের মধ্যে উৎপাদনে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

উত্তরাঞ্চলে কৃষিভিত্তিক শিল্পের বিকাশে অর্থায়ন বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। পাশাপাশি দেশের ওষুধশিল্পের মান যাচাইয়ের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে আসবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা।

সরকারের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিকল্পনায় জ্বালানি নিরাপত্তাকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। পর্যাপ্ত মজুত, দেশীয় উৎসের অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের কাঁচামালের নিরাপদ সরবরাহ নিশ্চিত করার মাধ্যমে ২০২৯ সালের মধ্যে একটি স্থিতিশীল জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলাই এখন সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর