খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই এপ্রিল ২০২৬, ১১:৪২ পিএম

নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলায় মোটরসাইকেল চালকদের জন্য ভুয়া ও জাল ড্রাইভিং লাইসেন্স তৈরি করার অপরাধে ‘মনির কম্পিউটার’ নামক একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার দুপুরে জলঢাকা থানা গেট সংলগ্ন এলাকায় এই ঝটিকা অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট জায়েদ ইমরুল মোজাক্কিন। এ সময় উপজেলা প্রশাসনকে জলঢাকা থানা পুলিশের একটি চৌকস দল সার্বিক নিরাপত্তা ও সহায়তা প্রদান করে।
Table of Contents
সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মোটরসাইকেলে জ্বালানি তেল সংগ্রহের ক্ষেত্রে ‘ফুয়েল কার্ড’ প্রদর্শনের বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। বর্তমানে ফুয়েল কার্ড ব্যতিরেকে কোনো ফিলিং স্টেশন বা পাম্প থেকে মোটরসাইকেলে পেট্রোল বা অকটেন সরবরাহ করা হচ্ছে না। এই ফুয়েল কার্ড সংগ্রহের জন্য চালকদের বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্সসহ প্রয়োজনীয় নথিপত্র ব্যবহার করে অনলাইনে সরকারি পোর্টালে আবেদন করতে হয়।
এই নতুন সরকারি নিয়মকে পুঁজি করে জলঢাকা থানা গেট এলাকায় অবস্থিত ‘মনির কম্পিউটার’-এর স্বত্বাধিকারী মনির হোসেন একটি জালিয়াতি চক্র গড়ে তোলেন। সাধারণ ও অসচেতন মোটরসাইকেল চালকরা যখন ফুয়েল কার্ডের আবেদনের উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র স্ক্যান বা অনলাইন আবেদনের জন্য তার দোকানে আসতেন, তখন মনির তাদের স্বল্প সময়ে এবং কোনো পরীক্ষা ছাড়াই লাইসেন্স পাইয়ে দেওয়ার প্রলোভন দেখাতেন। তিনি বিআরটিএ-এর (BRTA) মূল ড্রাইভিং লাইসেন্সের গ্রাফিক ডিজাইন নকল করে হুবহু জাল ও ভুয়া লাইসেন্সের কপি তৈরি করে চালকদের হাতে তুলে দিতেন। অনেক চালক এই ভুয়া লাইসেন্স ব্যবহার করে ফুয়েল কার্ডের জন্য আবেদন করার চেষ্টা করছিলেন, যা পরবর্তীতে বিআরটিএ-এর ডাটাবেস যাচাইকালে ধরা পড়ে। বিষয়টি স্থানীয় প্রশাসনের নজরে এলে তদন্ত সাপেক্ষে এই বিশেষ অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বৃহস্পতিবার দুপুরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জায়েদ ইমরুল মোজাক্কিন পুলিশ সদস্যদের নিয়ে মনির কম্পিউটারে আকস্মিক তল্লাশি চালান। অভিযানে দোকানটির কম্পিউটারের হার্ডডিস্ক পরীক্ষা করে বিপুল পরিমাণ ভুয়া ড্রাইভিং লাইসেন্সের সফটকপি, নকশা এবং পূর্বেই প্রিন্ট করা বেশ কিছু ভুয়া লাইসেন্সের কপি জব্দ করা হয়। অভিযুক্ত দোকান মালিক মনির হোসেনের উপস্থিতিতেই এসব অবৈধ ডিজিটাল নথিপত্র উদ্ধার করা হয় এবং তিনি জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে জালিয়াতির কথা স্বীকার করেন।
তৎক্ষণাৎ পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত দণ্ডবিধি এবং সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার ও ডিজিটাল নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইনের বিধান অনুযায়ী অভিযুক্ত মনির হোসেনকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড প্রদান করেন। একই সঙ্গে জনস্বার্থে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের রাষ্ট্রবিরোধী ও জালিয়াতিমূলক কর্মকাণ্ড রোধে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানটি অনির্দিষ্টকালের জন্য সিলগালা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।
অভিযান শেষে জলঢাকা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জায়েদ ইমরুল মোজাক্কিন সাংবাদিকদের বলেন, “মোটরসাইকেল চালকদের বিভ্রান্ত করে জাল নথিপত্র সরবরাহ করা একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এটি কেবল একটি সাধারণ জালিয়াতি নয়, বরং এর মাধ্যমে অযোগ্য চালকরা রাস্তায় নামার সুযোগ পাচ্ছে, যা সড়ক দুর্ঘটনা বৃদ্ধি এবং জননিরাপত্তার জন্য চরম হুমকি স্বরূপ।” তিনি আরও যোগ করেন:
“সুনির্দিষ্ট প্রমাণের ভিত্তিতে আমরা এই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। সাধারণ জনগণের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান থাকবে, আপনারা কোনো অসাধু চক্রের প্রলোভনে পা দেবেন না। ড্রাইভিং লাইসেন্স বা ফুয়েল কার্ড সংক্রান্ত সকল সেবা শুধুমাত্র সরকার নির্ধারিত বিআরটিএ অফিস বা অনুমোদিত অনলাইন পোর্টাল থেকে গ্রহণ করবেন।”
জলঢাকায় পরিচালিত এই অভিযান স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সচেতন মহলের মতে, থানা গেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের জালিয়াতি চক্রের সক্রিয় থাকা উদ্বেগের বিষয়। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, জব্দকৃত তথ্য বিশ্লেষণ করে এই চক্রের সাথে অন্য কেউ জড়িত আছে কি না তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া যারা ইতোমধ্যেই এই দোকান থেকে জাল লাইসেন্স তৈরি করেছেন, তাদের শনাক্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ফুয়েল কার্ডের আবেদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় এ ধরনের তদারকি নিয়মিত অব্যাহত থাকবে। ৩০ এপ্রিলের এই অভিযানের মাধ্যমে অন্যান্য কম্পিউটার ব্যবসায়ীদেরও সর্তক করা হয়েছে যেন তারা কোনো প্রকার অবৈধ বা জালিয়াতিমূলক কাজে লিপ্ত না হন। ১ মে থেকে কার্যকরভাবে এই সিলগালা আদেশ বহাল থাকবে এবং জব্দকৃত সরঞ্জামাদি আইনানুযায়ী ধ্বংস বা বাজেয়াপ্ত করা হবে।
মন্তব্য