চট্টগ্রামে অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ আন্তঃজেলা কারবারি চক্রের ৪ সদস্য গ্রেপ্তার

চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন এলাকায় পরিচালিত ধারাবাহিক ও পৃথক অভিযানে বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র, বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ এবং অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ চারজন সক্রিয় অস্ত্র ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার সকালে চট্টগ্রাম নগরের দামপাড়া পুলিশ লাইন্সস্থ মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করে। সিএমপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিরা একটি সুসংগঠিত চক্রের সদস্য এবং তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্রের কারবার চালিয়ে আসছিলেন।


গ্রেপ্তারকৃতদের বিস্তারিত পরিচয়

পুলিশি অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া চার ব্যক্তির রাজনৈতিক ও অপরাধমূলক প্রোফাইল বিশ্লেষণ করে তাদের পরিচয় নিশ্চিত করা হয়েছে। তারা হলেন:

  • মো. হাসান (২৮): হাটহাজারী উপজেলার ফরহাদাবাদ ইউনিয়নের মো. জাফর আহমদের পুত্র। হাসান বায়েজিদ বোস্তামী এলাকার দুর্ধর্ষ অপরাধী হিসেবে পরিচিত এবং তার বিরুদ্ধে ওই থানায় ইতিপূর্বে আরও পাঁচটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।

  • নুর উদ্দীন সোহেল (৩০): সাতকানিয়া উপজেলার দক্ষিণ কাঞ্চনা গ্রামের নুরুল হোসেনের পুত্র।

  • তাপস পালিত ওরফে শিমুল (৫১): পটিয়া উপজেলার ধলঘাট ইউনিয়নের মৃত সন্তোষ পালিতের পুত্র।

  • দীপক কান্তি দে (৫৮): ফটিকছড়ি উপজেলার ভূজপুর থানার মৃত ননী গোপাল কান্তি দের পুত্র।


উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও সরঞ্জামের খতিয়ান

অভিযান চলাকালীন পুলিশ আসামিদের হেফাজত থেকে দেশি ও বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্রসহ প্রাণঘাতী সরঞ্জামের একটি বিশাল মজুত জব্দ করেছে। উদ্ধারকৃত মালামালের মধ্যে রয়েছে:

  • আগ্নেয়াস্ত্র: দুটি আধুনিক বিদেশি পিস্তল, দুটি শটগান এবং একটি দেশি একনলা বন্দুক।

  • গোলাবারুদ: সর্বমোট ৫০ রাউন্ড তাজা গুলি (এর মধ্যে ২৮ রাউন্ড পিস্তলের গুলি, ২০ রাউন্ড অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি এবং ২ রাউন্ড বিশেষায়িত চায়না রাইফেলের গুলি)।

  • আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম: দুটি ম্যাগাজিন, চারটি ধারালো চাপাতি এবং তিনটি আত্মরক্ষামূলক রিকয়েলিং স্প্রে।

  • নির্মাণ সামগ্রী: অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় কিছু বিশেষ যন্ত্র ও কাঁচামাল।


অভিযানের ধারা ও ঘটনাক্রম

সিএমপির গোয়েন্দা শাখার তথ্যানুযায়ী, গত বুধবার (২৯ এপ্রিল) ভোররাত থেকে নগরীর তিনটি ভিন্ন পয়েন্টে এই সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করা হয়।

১. অক্সিজেন ও চেরাগী পাহাড় অভিযান: বুধবার ভোরে বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন অক্সিজেন মোড় এলাকায় প্রথম অভিযানটি চালানো হয়। সেখান থেকে নুর উদ্দীন সোহেলকে একটি বিদেশি পিস্তল ও ম্যাগাজিনসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর পুলিশ কোতোয়ালী থানার চেরাগী পাহাড় এলাকায় তাপস পালিতের বাসায় হানা দেয়। সেখান থেকে তাপসকে গ্রেপ্তারসহ তার শয়নকক্ষ থেকে ১০ রাউন্ড পিস্তলের গুলি উদ্ধার করা হয়।

২. ওয়াজেদিয়া এলাকা অভিযান: একই দিন দুপুরে ওয়াজেদিয়া এলাকায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে দীপক কান্তি দে-কে গ্রেপ্তার করা হয়। তার হেফাজত থেকে আরও একটি বিদেশি পিস্তল, ম্যাগাজিন এবং ১৮ রাউন্ড পিস্তলের গুলিসহ চায়না রাইফেলের গুলি উদ্ধার করে পুলিশ।

৩. ড্রিমল্যান্ড ও হাটহাজারী অভিযান: পৃথক একটি দল বায়েজিদ বোস্তামী থানার ড্রিমল্যান্ড আবাসিক এলাকা থেকে মো. হাসানকে গ্রেপ্তার করে। পরবর্তীতে হাসানের দেওয়া তথ্যানুযায়ী হাটহাজারীতে তার গ্রামের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখা তিনটি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২০ রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।


পুলিশের ভাষ্য ও আইনি পদক্ষেপ

সংবাদ ব্রিফিংয়ে সিএমপির উত্তর জোনের উপ-কমিশনার আমিরুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা স্বীকার করেছেন যে তারা মূলত মধ্যস্থতাকারী ও বিক্রেতা হিসেবে কাজ করতেন। তারা দেশের সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা থেকে অবৈধ উপায়ে আধুনিক অস্ত্র সংগ্রহ করে চট্টগ্রামসহ পার্শ্ববর্তী জেলার সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর কাছে চড়া দামে বিক্রি করতেন। উদ্ধারকৃত কোনো অস্ত্রের বৈধ লাইসেন্স তারা উপস্থাপন করতে পারেননি।

বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল করিম জানান, গ্রেপ্তারকৃত চারজনের বিরুদ্ধে ১৮৭৮ সালের অস্ত্র আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার দুপুরেই তাদের বিজ্ঞ আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে। পুলিশ এই চক্রের মূল হোতা এবং অস্ত্র সংগ্রহের মূল উৎস শনাক্ত করতে আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন জানাবে।


নিরাপত্তা ও সামাজিক প্রভাব

চট্টগ্রাম মহানগরীতে সম্প্রতি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে সিএমপি এই অভিযানকে একটি বড় সাফল্য হিসেবে দেখছে। বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদসহ একটি অস্ত্র ব্যবসায়ী চক্রকে নিষ্ক্রিয় করায় সম্ভাব্য বড় ধরনের অপরাধ সংঘটন রোধ করা সম্ভব হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। মহানগরীর শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষায় এ ধরনের বিশেষ ও গোয়েন্দা ভিত্তিক অভিযান আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এই অভিযানের ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফিরবে এবং অপরাধীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।