,

‘মহিলা বাস’ দিয়ে শুরু, এবার ‘পিংক বাসে’ নারীদের জন্য নতুন উদ্যোগ

বাংলাদেশের গণপরিবহনে নারীদের নিরাপত্তা, স্বস্তি এবং কর্মজীবী নারী ও শিক্ষার্থীদের নির্বিঘ্ন যাতায়াত নিশ্চিত করার দীর্ঘ লড়াইয়ে যুক্ত হয়েছে এক নতুন অধ্যায়। ১৯৯৭ সালে তৎকালীন সরকারের হাত ধরে নারীদের জন্য পৃথক বাসসেবার যে সূচনা হয়েছিল, নানা প্রতিকূলতা ও অব্যবস্থাপনার পথ পেরিয়ে তা বর্তমান সময়ে এসে রূপ নিয়েছে আধুনিক ‘পিংক বাস’ সার্ভিসে। বিগত প্রায় তিন দশকে বহুবার এই উদ্যোগ নেওয়া হলেও টেকসই ব্যবস্থাপনার অভাবে তা বারবার হোঁচট খেয়েছে। তবে অতীতের সমস্ত ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার পুরোপুরি নতুন আঙ্গিকে নারীদের জন্য এই বিশেষ সেবা চালু করা হয়েছে।

১৯৯৭-৯৮: ‘মহিলা বাস’ চালুর প্রথম প্রয়াস

বাংলাদেশে নারীদের জন্য স্বতন্ত্র বাসসেবার প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৭ সালে। সে সময় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর উদ্যোগে এবং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) প্রথম পৃথক মহিলা বাসসেবা চালু করে। এর মূল লক্ষ্য ছিল কর্মজীবী নারী ও স্কুল-কলেজের ছাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা। এরপর ১৯৯৮ সালের শেষভাগ কিংবা ১৯৯৯ সালের শুরুর দিকে তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদের যাতায়াত সহজ করতে আরও একটি বিশেষ বাসসেবা চালুর পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয়। যদিও ওই উদ্যোগগুলো সে সময় নারী যাত্রীদের মধ্যে বেশ সাড়া ফেলেছিল, তবে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবে তা স্থায়ী রূপ পায়নি।

২০০১-০৪: শতদিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচিতে নতুন উদ্যোগ

২০০১ সালের রাজনৈতিক পালাবদলের পর নতুন সরকার তাদের প্রথম ১০০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচির অংশ হিসেবে নারীদের যাতায়াতের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে বন্ধ হয়ে যাওয়া মহিলা বাসসেবাকে নতুনভাবে সাজিয়ে ২০০২ সালের শুরুতে ঢাকা ও এর আশপাশের গুরুত্বপূর্ণ রুটে সরকারি অর্থায়নে বড় পরিসরে পুনরায় চালু করা হয়। প্রথম দুই-তিন বছর সেবাটি তুলনামূলকভাবে সুশৃঙ্খলভাবে চললেও পরবর্তীতে লিজ নেওয়া বাসগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ ও তদারকিতে চরম দুর্বলতা দেখা দেয়। ফলে বাসগুলো একের পর এক বিকল হতে শুরু করে। ২০০৪ সালের আগস্টে ২২টি বাস দিয়ে রুটগুলো নতুন করে সাজানোর চেষ্টা করা হলেও পরবর্তী সময়ে সচল বাসের সংখ্যা কমতে কমতে মাত্র ১১টিতে নেমে আসে এবং একপর্যায়ে সেবাটি প্রায় পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ে।

২০০৮ থেকে ২০২৪: বারবার ফিরে আসার গল্প ও স্থবিরতা

নারীদের এই বিশেষ বাসসেবা পুরোপুরি বিলুপ্ত না করে বিআরটিসি বিভিন্ন সময়ে তা পুনরুজ্জীবিত করার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৮ সালের জুলাইয়ে মিরপুর-গুলিস্তান এবং খিলগাঁও তালতলা-গুলিস্তান রুটে মাত্র পাঁচটি বাস দিয়ে আবারও বিশেষ নারী বাসসেবা চালু করা হয়। ২০০৯ সালের পর সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সেবাটি টিকিয়ে রাখার নতুন চেষ্টা করা হয় এবং ২০১৫ সাল নাগাদ সচল বাসের সংখ্যা ১২টিতে উন্নীত করা হয়।
তবে এরপরও সেবাটি কাঙ্ক্ষিত স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারেনি। ২০২৪ সালের শুরুতে সচল বাসের সংখ্যা কমে সাত থেকে নয়টিতে এসে ঠেকে। পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাবের কারণে অনেক নারী যাত্রী জানতেন না ঠিক কখন, কোথায় এবং কোন রুটে এসব বাস চলাচল করে। ফলে অনেক সময় বাসগুলো যাত্রীস্বল্পতায় চলত এবং বাধ্য হয়ে কোথাও কোথাও পুরুষ যাত্রী তুলে সেগুলোকে সাধারণ বাসের মতো ব্যবহার করা হতো। এর ফলে নারী যাত্রীদের জন্য আলাদা বাস চালুর মূল উদ্দেশ্যই অনেকাংশে ব্যাহত হয়েছিল।

২০২৬: ‘পিংক বাসে’ নতুন যুগের সূচনা

আগের উদ্যোগগুলোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা এবং নানা ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ২০২৬ সালের ১৮ আগস্ট বিআরটিসি নারীদের জন্য নতুন রূপ ও ব্যবস্থাপনায় ‘পিংক বাস সার্ভিস’ চালু করেছে। এবারের আয়োজনে কেবল বাসের গায়ের রঙ পরিবর্তন করা হয়নি, বরং পুরো পরিচালন ব্যবস্থাতেই আনা হয়েছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানান, বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত এই বিশেষায়িত পিংক বাস সার্ভিস চালু করা হয়েছে। নারীদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করার পাশাপাশি গণপরিবহনে নারীদের কর্মসংস্থান ও অংশগ্রহণ বাড়াতে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
এবারের উদ্যোগের সবচেয়ে বড় অভিনবত্ব হলো নারী চালক ও নারী কন্ডাক্টরদের সরাসরি সম্পৃক্ত করা। প্রথমবারের মতো বিশেষ এই সেবায় নারী চালকদের প্রস্তুত করতে দীর্ঘ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং প্রাথমিকভাবে প্রায় ১৬ জন নারী চালককে এই কাজের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
নতুন এই ধাপে মোট ১৪টি আকর্ষণীয় গোলাপি রঙের দোতলা বাস সড়কে নামানো হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন রুটে চলাচল করছে ১০টি বাস, বগুড়ায় দুটি এবং বন্দরনগরী চট্টগ্রামে দুটি বাস চালুর ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন বাজার-মতিঝিল, তালতলা-মতিঝিল, ডেমরা-জিপিও, মিরপুর-মতিঝিল, মোহাম্মদপুর-মতিঝিল, আব্দুল্লাহপুর-মতিঝিল, গাজীপুর-বিমানবন্দর এবং নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুট। এছাড়া বগুড়ায় শেরপুর-মাটিডালি এবং চট্টগ্রামে কালুরঘাট-পতেঙ্গা রুটে এসব বাস নিয়মিত চলাচল করছে।

অতীতের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ

প্রায় তিন দশকের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা সাক্ষ্য দেয় যে, নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর উদ্যোগের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ধারাবাহিকতার অভাব। নতুন বাস রাস্তায় নামলেও পর্যাপ্ত যানবাহন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, সঠিক সময়সূচি প্রকাশ, ব্যাপক প্রচারণা, নিখুঁত রুট ব্যবস্থাপনা এবং কঠোর তদারকির ঘাটতি থাকলে কয়েক বছর পর আবারও একই সংকটের পুনরাবৃত্তি হতে পারে। অতীতে লিজ ব্যবস্থার কারণে সেবাটি মার খেলেও এবার সরাসরি সরকারি ব্যবস্থাপনা এবং নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগের বিষয়টি আগের উদ্যোগগুলোর চেয়ে এটিকে অনেকটাই আলাদা করেছে।
গণপরিবহনে নারীদের হয়রানি, অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ ও চরম নিরাপত্তাহীনতা কমানোর লক্ষ্যেই এই নতুন ‘পিংক বাস’ চালু করা হয়েছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো, বিগত তিন দশকের নানামুখী অভিজ্ঞতার আলোকে এবার এই সেবা কতটা টেকসই, সুশৃঙ্খল ও কার্যকরভাবে টিকিয়ে রাখা যায়।
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।