জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকটে বাড়ছে নিত্যপণ্যের দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়

গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকট এখন আর শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার বিষয় নয়। এর প্রভাব ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে খাদ্যপণ্য, পোলট্রি, পরিবহন, নির্মাণ, ভোগ্যপণ্যসহ অর্থনীতির প্রায় সব স্তরে। উৎপাদন কমে যাওয়া, সরবরাহে অনিয়ম, জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং কারখানায় ঘন ঘন উৎপাদন বন্ধ থাকার কারণে একদিকে ব্যবসায়ীদের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে তার চাপ গিয়ে পড়ছে সাধারণ ভোক্তার ওপর। ফলে একই আয় দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে।

রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামে ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। মগবাজারে এক লিটার খোলা সয়াবিন তেল কিনতে ১৯৫ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। কয়েক সপ্তাহ আগেও একই পরিমাণ তেল প্রায় ১৮০ টাকায় পাওয়া যেত। ব্যবসায়ীদের বক্তব্য, সরবরাহ পর্যায়ে দাম বাড়ার কারণেই খুচরা বাজারে এর প্রভাব পড়ছে।

কারওয়ান বাজারে তিন দিনের ব্যবধানে চিনির দাম কেজিতে ১১০ টাকা থেকে বেড়ে ১৩০ টাকা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ক্রেতারা। ৫০ কেজির চিনির বস্তির দামও পরিবেশকদের পর্যায়ে এক দিনের ব্যবধানে প্রায় ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি। ফলে খুচরা বিক্রেতাদেরও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি করতে হচ্ছে।

গ্যাস সরবরাহে চাপ, বিদ্যুৎ উৎপাদনেও প্রভাব

মহেশখালীর একটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর কয়েক সপ্তাহ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতি আরও চাপে পড়ে। প্রয়োজনীয় গ্যাস না পাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। এর ফল হিসেবে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাট বেড়েছে এবং শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।

বিশেষ করে যেসব শিল্পে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গ্যাস ও বিদ্যুতের সরাসরি প্রয়োজন হয়, সেসব খাতে সংকটের প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান হচ্ছে। কারখানা নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে না পারলে উৎপাদনের পরিমাণ কমে যায়। একই সঙ্গে শ্রম, যন্ত্রপাতি, গুদাম ও অন্যান্য স্থায়ী ব্যয় প্রায় অপরিবর্তিত থাকে। ফলে প্রতি ইউনিট পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। পরে সেই বাড়তি ব্যয় বাজারমূল্যে যুক্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

ভোজ্য তেলের বাজারেও সরবরাহের চাপ রয়েছে। সরকার খোলা সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ১৮০ টাকা এবং পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৯৭৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু কিছু বাজারে খোলা তেল ১৯০ থেকে ১৯৫ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। পাম তেলের ক্ষেত্রেও নির্ধারিত মূল্যের তুলনায় কিছুটা বেশি দাম নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

রিফাইনারদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন দাম নির্ধারণের কথা বলা না হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের মূল্যবৃদ্ধি এবং জ্বালানি সংকটজনিত পরিচালন ব্যয়কে চাপের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

আটা, ময়দা, ডাল ও দুধেও বাড়তি চাপ

নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারেও দাম বাড়ার প্রবণতা রয়েছে। খোলা আটা কেজিতে প্রায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকা এবং প্যাকেটজাত আটা ৬৫ থেকে ৭০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা ময়দার দাম ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা ৭৫ থেকে ৮৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

বিভিন্ন ধরনের ডালের দামও কেজিতে প্রায় ৫ থেকে ১০ টাকা বেড়েছে। ব্র্যান্ডভেদে গুঁড়া দুধের দাম কেজিতে ২০ থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। কোনো কোনো পণ্যের দাম কেজিতে প্রায় ৯৬০ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। গত দুই মাসে পোলাও চালের দামও কেজিতে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেড়েছে বলে বাজারসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

সরবরাহের অনিয়মও ভোক্তাদের জন্য নতুন সমস্যা তৈরি করছে। কারওয়ান বাজারের এক বিক্রেতার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে একটি জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের সয়াবিন তেল নিয়মিত পাওয়া যাচ্ছে না। অন্য কয়েকটি তেলও চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ হচ্ছে।

লোডশেডিংয়ে চাপে পোলট্রি খাত

বিদ্যুৎ সংকটের প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে পড়ছে পোলট্রি খাতে। প্রায় দুই সপ্তাহের ব্যবধানে ঢাকার বাজারে এক ডজন ডিমের দাম ১৩০ টাকা থেকে বেড়ে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায় উঠেছে। একই সময়ে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে প্রায় ১৮০ টাকা থেকে বেড়ে ২০০ টাকার কাছাকাছি হয়েছে।

খামারিরা বলছেন, বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি অতিরিক্ত গরমে মুরগির মৃত্যুহার বেড়েছে। হ্যাচারিতে ডিম থেকে বাচ্চা উৎপাদনের জন্য দীর্ঘ সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ প্রয়োজন। বিদ্যুৎ না থাকলে জেনারেটর ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু ডিজেলের বাড়তি খরচ সেই বিকল্প ব্যবস্থাকেও ব্যয়বহুল করে তুলছে।

ফলে উৎপাদন ব্যয় একদিকে বাড়ছে, অন্যদিকে সরবরাহ কমছে। এই দুই ধরনের চাপ একসঙ্গে বাজারে ডিম ও মাংসের দাম বাড়াচ্ছে।

পণ্যের পরিমাণ কমলেও কমছে না খরচ

ভোক্তাদের ওপর চাপের আরেকটি দিক হলো পণ্যের প্যাকেটের আকার ছোট হয়ে যাওয়া। বাজারে এমন পণ্য রয়েছে, যেগুলোর ওজন কমানো হলেও দাম একই রাখা হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আবার পরিমাণ কমানোর পাশাপাশি দামও বাড়ানো হয়েছে।

একটি সাবানের ওজন ৩০০ গ্রাম থেকে কমিয়ে ২৭৫ গ্রাম করা হলেও দাম ৪০ টাকা রাখা হয়েছে। একইভাবে ২০০ গ্রামের একটি চুলের তেলের বোতলের পরিমাণ কমিয়ে ১৯০ গ্রাম করা হয়েছে, অথচ দাম ২০ টাকা বেড়েছে।

ডিটারজেন্টের দামও বেড়েছে। একটি ব্র্যান্ডের প্রতি কেজির দাম প্রায় ২০ টাকা বেড়ে ১৬৫ টাকা এবং আরেকটির দাম ১৫ টাকা বেড়ে ১৯৫ টাকা হয়েছে। সাবান, বিস্কুটসহ আরও কিছু পণ্যে প্যাকেটের পরিমাণ কমানোর প্রবণতা রয়েছে বলে খুচরা বিক্রেতারা জানিয়েছেন।

শিল্পে কমছে উৎপাদন, বাড়ছে প্রতি ইউনিট খরচ

গ্যাসের স্বল্পচাপ ও বিদ্যুৎ সংকটে জ্বালানি-নির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের দাবি, গ্যাস সরবরাহের সমস্যায় ৯০০টির বেশি টেক্সটাইল মিল সাময়িকভাবে উৎপাদন বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে। তৈরি পোশাক, ইস্পাত, কাগজ, প্লাস্টিক ও সিরামিক শিল্পেও সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদন হচ্ছে।

ইস্পাত শিল্পে পরিস্থিতি আরও কঠিন। উৎপাদন কমে গেলেও কারখানার অনেক স্থায়ী ব্যয় একই থাকে। ফলে কম পরিমাণ পণ্যের ওপর সেই ব্যয় ভাগ হওয়ায় প্রতি টন উৎপাদনের খরচ বেড়ে যায়। শিল্পসংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তার হিসাবে, বর্তমানে প্রতি টন রড উৎপাদনে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে।

সিমেন্ট শিল্পেও গত এক মাসে উৎপাদন ব্যয় অন্তত ১০ শতাংশ বেড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের হিসাব। বিদ্যুৎ বা গ্যাসের সমস্যায় ভারী যন্ত্রপাতি বন্ধ হয়ে গেলে পুনরায় চালু করতে সময় লাগে। এতে উৎপাদন ক্ষতির পাশাপাশি যন্ত্রপাতি চালু ও বন্ধের অতিরিক্ত ব্যয়ও যোগ হয়।

পরিবহন খরচেও পড়ছে জ্বালানি সংকটের প্রভাব

গ্যাস সংকটের প্রভাব নগর পরিবহনেও দৃশ্যমান। এলিফ্যান্ট রোড থেকে বাড্ডা যেতে যেখানে সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা ভাড়া চাওয়া হয়, সেখানে একজন সিএনজি অটোরিকশাচালক ৫০০ টাকা পর্যন্ত দাবি করেছেন।

চালকদের ভাষ্য, গ্যাস নিতে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। এতে দিনে গাড়ি চালানোর কার্যকর সময় কমে যাচ্ছে। আবার গাড়ির মালিককে দৈনিক নির্ধারিত জমা দেওয়ার পর জ্বালানি ও অন্যান্য খরচ মেটানোও কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে বাড়তি ভাড়া নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।

এর প্রভাব শুধু যাত্রী পরিবহনে সীমাবদ্ধ থাকছে না। পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়লে সেই খরচও শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়। উৎপাদন থেকে পরিবহন, পরিবহন থেকে পাইকারি এবং সেখান থেকে খুচরা বাজার—প্রতিটি ধাপে ব্যয় বাড়তে থাকলে ভোক্তার ওপর চূড়ান্ত চাপ আরও তীব্র হয়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে তাই গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটকে শুধু শিল্প খাতের সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। উৎপাদন ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, পণ্যের সরবরাহ কমে যাওয়া এবং বাজারমূল্য বেড়ে যাওয়ার একটি ধারাবাহিক প্রভাব তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে কিছু পণ্যের প্যাকেটের পরিমাণ কমে যাওয়ায় ভোক্তার প্রকৃত ব্যয় আরও বাড়ছে।

গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই ব্যয়ের চাপ অর্থনীতির আরও বিস্তৃত অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। সবচেয়ে বেশি চাপ পড়বে সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। কারণ আয় একই থাকলেও খাদ্য, পরিবহন ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে তাদের আগের তুলনায় বেশি অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে। ফলে বাজারের এই সংকট এখন সরাসরি পারিবারিক বাজেট ও জীবনযাত্রার ওপর প্রভাব ফেলছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর