জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

পুলিশের গল্পের চিত্রনাট্য ভালো, তবে পাগলেও বিশ্বাস করবে না: শিক্ষক-মহিলা পরিষদ

রংপুরে অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীসহ একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় পুলিশের দেওয়া ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। হত্যার কারণ, ঘটনার বর্ণনা এবং ময়নাতদন্তের তথ্য—তিন ক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে অসঙ্গতি। এর মধ্যে পুলিশ যে ‘গল্প’ তুলে ধরেছে, তা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে দাবি করেছেন রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থী এবং মহিলা পরিষদের নেত্রীরা।

 

সোমবার নগরীতে পৃথক বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসূচিতে বক্তারা বলেন, চার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দুই যুবককে গ্রেফতার করে তাদেরই মূল আসামি হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। পুলিশের দেওয়া ঘটনাবিবরণী তাদের কাছে ‘সাজানো নাটক’ বলে মনে হচ্ছে।

 

রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আব্দুল মাবুদ রবিবার সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় সিদ্ধার্থ দাস ও মুগ্ধ দাস চারজনকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এরপর তারা ওই বাড়িতে গোসল করেন, ফ্রিজ থেকে শসা ও খেজুর বের করে খান এবং নিজেদের মোবাইল ফোন পানিতে ডিটারজেন্ট দিয়ে নষ্ট করেন। পুলিশ জানায়, বৃহস্পতিবার রাতে হত্যাকাণ্ডের পর শুক্রবার জুমার নামাজের সময় পর্যন্ত তারা বাড়িটিতে অবস্থান করেন।

 

পুলিশের এই বক্তব্যের সমালোচনা করে রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক শফিয়ার রহমান বলেন, দুই মাদকসেবী পরপর চারজনকে হত্যা করে দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেছেন—এমন বক্তব্য বিশ্বাসযোগ্য নয়।

 

তিনি বলেন, চারজনকে হত্যার পর গোসল করা, ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে খাওয়া এবং মোবাইল ফোন নষ্ট করার যে বর্ণনা পুলিশ দিয়েছে, তা তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না।

 

সমাবেশে সাবেক শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক কর্মী ডলার বলেন, শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ও তার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ুয়া সন্তানসহ পরিবারের চারজনকে মাদক সেবনে বাধা দেওয়ার কারণে দুই যুবক হত্যা করেছে—পুলিশের এই বক্তব্য তারা বিশ্বাস করেন না। তিন দিনের মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন না হলে নগরী অচল করে দেওয়ারও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

 

রংপুর জেলা মহিলা পরিষদের সভাপতি রুমানা জামান আরও সরাসরি পুলিশের বক্তব্যের সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘পুলিশ যে গল্প বানিয়েছে, চিত্রনাট্য ভালো; তবে গল্পটি একেবারেই পছন্দ করেনি মানুষ।’

 

তিনি প্রশ্ন তোলেন, দুই ব্যক্তি অল্প সময়ের মধ্যে একই পরিবারের চারজনকে হত্যা করে দীর্ঘ সময় ওই বাড়িতে অবস্থান করেছেন—পুলিশের এই বর্ণনা বাস্তবে কতটা সম্ভব।

 

শুধু পুলিশের বক্তব্যের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের প্রশ্নেরই অমিল নয়, ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসকের বক্তব্যের সঙ্গেও পুলিশের দেওয়া কিছু তথ্যের পার্থক্য সামনে এসেছে।

 

রবিবার সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ কমিশনার দাবি করেন, নিহত আগামী চক্রবর্তীকে শ্বাসরোধ করার সময় তার চোয়াল ভেঙে যায় এবং চোখ বের হয়ে যায়। তবে ময়নাতদন্তকারী রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. বাবলু কিশোর বিশ্বাস সোমবার সাংবাদিকদের বলেন, আগামী চক্রবর্তীর চোয়াল বা চোখ বের হয়নি।

 

চিকিৎসক জানান, তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ফরেনসিক রিপোর্ট না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর মূল কারণ নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

 

এ ছাড়া মরদেহগুলোর মুখমণ্ডল বিকৃত হওয়ার কারণ নিয়েও পুলিশের প্রাথমিক ধারণার সঙ্গে চিকিৎসকের বক্তব্যে পার্থক্য রয়েছে। পুলিশ ও সিআইডির প্রাথমিক ধারণায় মরদেহে রাসায়নিক বা অ্যাসিড ব্যবহারের কথা বলা হলেও ময়নাতদন্তকারী চিকিৎসক জানিয়েছেন, চারজনের মুখ বা শরীরে অ্যাসিডে ঝলসে যাওয়ার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় মরদেহ পড়ে থাকায় রক্ত ও টিস্যুর পরিবর্তনের স্বাভাবিক পচন প্রক্রিয়ায় মুখ কালচে ও বীভৎস হয়েছে বলে জানান তিনি।

 

এদিকে চার হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনের দাবিতে সোমবার রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল, মানববন্ধন ও সড়ক অবরোধ করেন। একই দাবিতে রংপুর জেলা মহিলা পরিষদ এবং রংপুর মহানগর নাগরিক কমিটিও পৃথক কর্মসূচি পালন করে।

 

নাগরিক কমিটির সদস্যসচিব পলাশ কান্তি নাগ বলেন, হত্যাকাণ্ডটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা চলছে বলে তাদের মনে হচ্ছে। তিনি বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে প্রকৃত রহস্য উদঘাটনের দাবি জানান।

 

এরই মধ্যে মামলাটির তদন্তভার রংপুর মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখা—ডিবির কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন ডিবির পরিদর্শক জিন্নাত আলী।

 

ডিবির উপকমিশনার সনাতন চক্রবর্তী জানিয়েছেন, পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য মামলাটি ডিবিতে দেওয়া হয়েছে। পুলিশ কমিশনারের সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের সঙ্গে দুই আসামির আদালতে দেওয়া জবানবন্দির মিল থাকলেও কিছু বিষয়ে তারা নতুন তথ্য দিয়েছে। সেসব বিষয়ও তদন্ত করে দেখা হবে।

 

তবে পুলিশের দাবি ও চিকিৎসকের বক্তব্যের পার্থক্য এবং চার হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে জনমনে তৈরি হওয়া প্রশ্নের মধ্যে এখন তদন্তের দিকেই তাকিয়ে রংপুরবাসী। প্রকৃত হত্যাকারী কারা, হত্যার নেপথ্যের কারণ কী এবং গ্রেফতার দুই যুবকের সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত সম্পর্ক কতটা—ডিবির তদন্তেই তার উত্তর মিলবে বলে প্রত্যাশা করছেন আন্দোলনকারীরা।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর