কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা দেশের দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত দৈনিক সরবরাহ সক্ষমতা প্রায় ১১০ কোটি ঘনফুট হলেও মঙ্গলবার জাতীয় গ্রিডে গ্যাস গেছে মাত্র ৬৬ কোটি ঘনফুট। ফলে সক্ষমতার তুলনায় সরবরাহ ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪৪ কোটি ঘনফুট।
এই ঘাটতির সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে এলএনজির মজুত কমে যাওয়া। টার্মিনালটিতে সরবরাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি নতুন এলএনজি কার্গো গ্রহণ নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে কোনো এলএনজিবাহী কার্গো জাহাজ না থাকায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।
গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রভাব ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন খাতে পড়তে শুরু করেছে। উৎপাদনমুখী শিল্পকারখানায় গ্যাসের চাপ কমেছে, কোথাও কোথাও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং আবাসিক গ্রাহকেরাও কম চাপের সমস্যায় পড়ছেন। পরিস্থিতি কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এখনই নিশ্চিত কোনো সময়সীমা দিতে পারছেন না।
Table of Contents
এক টার্মিনালে মজুত দ্রুত কমেছে
মহেশখালীতে থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দুটির একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনালের। দুটি টার্মিনালই দেশের জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
মঙ্গলবার আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপক (এলএনজি বিভাগ, কক্সবাজার) মোহাম্মদ ইমতিয়াজ কামাল চৌধুরীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সামিটের টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ৫৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে মিলেছে মাত্র ১১ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ দুই টার্মিনালের স্বাভাবিক সর্বোচ্চ সক্ষমতার তুলনায় জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৪৪ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে মজুত কমে আসাই সরবরাহ হ্রাসের অন্যতম কারণ।
ঝুঁকির কারণে কার্গো গ্রহণে আপত্তি
এলএনজি সরবরাহ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে একটি কার্গো গ্রহণের বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরব থেকে আসা একটি এলএনজিবাহী কার্গো টার্মিনাল গ্রহণ করেনি। কার্গোটি টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তরের ক্ষেত্রে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে—এমন কারণ দেখিয়ে এক্সিলারেট এনার্জি সেটি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।
কার্গোটি সৌদি আরামকোর সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এসেছিল। কিন্তু টার্মিনালে এলএনজি স্থানান্তরের সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় সেটি গ্রহণ করা হয়নি। বর্তমানে কার্গোটি ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চলছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
এই পরিস্থিতিতে নতুন একটি এলএনজি কার্গোর দিকে তাকিয়ে আছে কর্তৃপক্ষ। আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, আগামী ২০ আগস্ট একটি এলএনজিবাহী জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে আসার কথা রয়েছে। সেটি এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালে এলএনজি সরবরাহ করতে পারলে ওই টার্মিনাল থেকে জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের পরিমাণ বাড়তে পারে।
আরপিজিসিএলের ব্যবস্থাপক (এলএনজি বিভাগ, চট্টগ্রাম) মোহাম্মদ মঈন উদ্দীন চৌধুরী জানিয়েছেন, ২০ আগস্টের কার্গো দেশে আসার পর টার্মিনালে এলএনজি হস্তান্তর করা হলে সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার ব্যাহত সরবরাহ
মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল দুটির সরবরাহ ব্যবস্থায় সাম্প্রতিক সময়ে একাধিকবার সমস্যা দেখা দিয়েছে। গত ২১ জুলাই কারিগরি ত্রুটির কারণে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে ৫ আগস্ট গভীর রাতে সেখান থেকে আংশিকভাবে সরবরাহ পুনরায় শুরু হয়।
এর মধ্যেই সামিটের টার্মিনালেও সমস্যা দেখা দেয়। কার্গো ভেড়াতে না পারায় গত বুধবার ওই টার্মিনাল থেকেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। পরে শুক্রবার রাতে সামিটের টার্মিনাল থেকে আবার সরবরাহ শুরু হয়।
ফলে বর্তমানে গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক চাপ একসঙ্গে কাজ করছে। একদিকে টার্মিনালের কারিগরি সমস্যা, অন্যদিকে এলএনজির মজুত কমে যাওয়া এবং নতুন কার্গো গ্রহণে জটিলতা—সব মিলিয়ে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
শিল্প ও পরিবহনে বাড়ছে উদ্বেগ
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পকারখানা, সার উৎপাদন, পরিবহনসহ বিভিন্ন খাতে প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে উৎপাদনমুখী শিল্পে গ্যাসের চাপ কমে গেলে কারখানার স্বাভাবিক উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সিএনজি খাতেও গ্যাসের চাপ কমে গেলে ফিলিং স্টেশনগুলোতে সরবরাহ সীমিত হতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে যানবাহনের চলাচল ও যাত্রী পরিবহনের ওপর। আবাসিক গ্রাহকের ক্ষেত্রেও কম চাপের কারণে রান্নার কাজে ভোগান্তি বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় ২০ আগস্টের সম্ভাব্য এলএনজি কার্গোকে ঘিরেই আপাতত স্বস্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। তবে নতুন কার্গো আসার পর কত দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরবে, তা নির্ভর করবে টার্মিনালের মজুত, কার্গো গ্রহণ ও পুনঃগ্যাসীকরণ কার্যক্রমের ওপর।
বর্তমান পরিস্থিতি দেখিয়ে দিচ্ছে, দেশের গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় এলএনজি টার্মিনালগুলোর নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি টার্মিনালে কারিগরি ত্রুটি কিংবা কার্গো গ্রহণে সাময়িক জটিলতাও জাতীয় গ্রিডে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করতে পারে। আর সেই ঘাটতির চাপ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে শিল্প, পরিবহন ও সাধারণ গ্রাহকের ওপর।









