বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক ও টিকিট বিক্রির অধিকার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংস্থাটির সাম্প্রতিক উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের প্রধান নির্বাহী রিচার্ড মাস্টার্স। তাঁর অভিযোগ, এমন একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে ফিফা নিজেই নিজেদের জন্য বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, ফুটবলকে ঐক্যবদ্ধ রাখার সক্ষমতা রয়েছে—এমন একজন নতুন সভাপতি প্রার্থীর প্রয়োজন রয়েছে।
ফিফার সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বিশ্বকাপসহ সংস্থার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও টিকিট বিক্রির স্বত্ব ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন একটি প্রতিষ্ঠান গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ নামের ওই প্রকল্পের আওতায় বেসরকারি একটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে নতুন প্রতিষ্ঠানের ২১ শতাংশ শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনাও করা হয়েছিল।
তবে ঘোষণার পর থেকেই পরিকল্পনাটি নিয়ে ফুটবল অঙ্গনে ব্যাপক আপত্তি দেখা দেয়। ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা উয়েফাসহ একাধিক মহাদেশীয় ফুটবল কনফেডারেশন এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে। বিষয়টি এতটাই তীব্র পর্যায়ে পৌঁছায় যে, উয়েফা ফিফার প্রতিযোগিতাগুলো বয়কট করার হুমকিও দিয়েছিল।
পরবর্তীতে তীব্র চাপ ও বিরোধিতার মুখে প্রকল্পটি বাতিল করা হয়। কিন্তু পরিকল্পনাটি প্রত্যাহার করলেও এর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক প্রভাব থেকে ফিফা এখনও পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেনি। বিশেষ করে ফিফা সভাপতির নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে।
ইংলিশ ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন ইনফান্তিনোর প্রতি তাদের সমর্থন প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মাস্টার্স সেই সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন। তাঁর মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ফুটবলের বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে বিভাজন কমিয়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
বিবিসি স্পোর্টসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মাস্টার্স বলেন, ফিফার বর্তমান সংকট বাইরের কোনো পক্ষ তৈরি করেনি; বরং এটি সংস্থাটির নিজেদের সিদ্ধান্তের ফল। তাঁর ভাষায়, এটি ‘ফিফার নিজের তৈরি করা সমস্যা’।
মাস্টার্স আরও বলেন, ফিফা এমন একটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যার ফলে নিজেদের জন্যই বড় ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে। তিনি এটিকে এমন এক আত্মঘাতী পদক্ষেপ হিসেবে বর্ণনা করেন, যেখানে সংস্থাটি যেন নিজের ‘বিনাশের বোতাম’ নিজেই চেপে দিয়েছে। এখন সেই সিদ্ধান্তের কারণে তৈরি হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধানের দায়িত্বও ফিফাকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এই বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ফুটবলের বাণিজ্যিক স্বত্ব ও তার নিয়ন্ত্রণ। বিশ্বকাপ ও অন্যান্য বড় প্রতিযোগিতা থেকে ফিফার বিপুল বাণিজ্যিক আয় হয়। ফলে এসব স্বত্ব কীভাবে পরিচালিত হবে, কার হাতে থাকবে এবং বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কী ধরনের ভূমিকা থাকবে—এসব বিষয় নিয়ে সদস্য দেশ, মহাদেশীয় কনফেডারেশন এবং ঘরোয়া ফুটবল কর্তৃপক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই সংবেদনশীলতা রয়েছে।
‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ পরিকল্পনাকে ঘিরে সেই পুরোনো মতপার্থক্যই নতুন করে সামনে আসে। বিশেষ করে উয়েফার মতো প্রভাবশালী মহাদেশীয় সংস্থার প্রকাশ্য বিরোধিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
মাস্টার্সের বক্তব্যে তাই শুধু একটি বাতিল হওয়া বাণিজ্যিক প্রকল্পের সমালোচনা নয়, ফিফার নেতৃত্ব ও ভবিষ্যৎ পরিচালন কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠে এসেছে। তিনি এমন নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন, যিনি বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে সমন্বয় করে বিশ্ব ফুটবলে ঐক্য ফিরিয়ে আনতে পারবেন।
ফলে ‘ফিফা ফরোয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ বাতিল হলেও এর সূত্র ধরে ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা এখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। সংস্থাটিকে সামনে এগোতে হলে বাণিজ্যিক স্বার্থের পাশাপাশি সদস্য সংগঠন ও মহাদেশীয় সংস্থাগুলোর সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন করাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।









