২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ২০ শতাংশে উন্নীত করার মহাপরিকল্পনা

বাংলাদেশের বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনে ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ থেকে ২০ শতাংশে উন্নীত করার একটি উচ্চাভিলাষী কিন্তু সময়োপযোগী সুপারিশ পেশ করা হয়েছে। বর্তমানে এই অনুপাত মাত্র ৬ শতাংশের ঘরে, যা দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বনিম্ন। বৃহস্পতিবার রাজধানীর বনানীতে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (পিআরআই) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ‘উন্নয়নের জন্য করনীতি: কর ব্যবস্থা পুনর্গঠনের সংস্কার কর্মসূচি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।

কর কাঠামো পুনর্গঠনের মূল লক্ষ্যসমূহ

গবেষণা প্রতিবেদনে জাতীয় কর ব্যবস্থাকে অধিকতর স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করার লক্ষ্যে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে। টাস্কফোর্সের প্রধান ও পিআরআই চেয়ারম্যান ড. জাইদি সাত্তারের উপস্থাপিত এই প্রতিবেদনে সরাসরি কর ও পরোক্ষ করের ভারসাম্য আনয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে দেশে পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা রয়েছে, যা সাধারণ মানুষের ওপর চাপের সৃষ্টি করে। প্রস্তাবিত সংস্কারে সরাসরি ও পরোক্ষ করের অনুপাত বর্তমানের ৭০:৩০ থেকে পরিবর্তন করে ৫০:৫০-এ নিয়ে আসার কথা বলা হয়েছে।

নিচে প্রস্তাবিত কর কাঠামোর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:

সারণি: ২০৩৫ সালের প্রস্তাবিত লক্ষ্যমাত্রা বনাম বর্তমান কর পরিস্থিতি

প্রধান সূচকসমূহবর্তমান অবস্থা (আনুমানিক)২০৩৫ সালের লক্ষ্যমাত্রা
কর-জিডিপি অনুপাত৬.০০%১৫.০০% – ২০.০০%
সরাসরি কর (জিডিপির শতাংশ)২.৫০%৯.০০% – ১০.০০%
শুল্কের অবদান (রাজস্ব আয়ে)২৮.০০%৭.৫০%
পরোক্ষ ও সরাসরি কর অনুপাত৭০ : ৩০৫০ : ৫০
শুল্কের অবদান (জিডিপিতে)২.৫০%১.০০%
ভ্যাট হারের সংখ্যা৭ – ৮টি১ – ২ টি

সরাসরি কর ও ভ্যাট সংস্কারের কৌশল

প্রতিবেদনটিতে সরাসরি কর, মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক—এই তিনটি প্রধান খাতে মোট ৫৫টি অগ্রাধিকার বিষয় চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সরাসরি কর খাতে ৩২টি, ভ্যাটে ১০টি এবং বাণিজ্য কর খাতে ১৩টি নীতিগত পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। টাস্কফোর্সের সদস্য ও কৃষি ব্যাংকের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে একাধিক ভ্যাট হার প্রচলিত থাকায় জটিলতা তৈরি হয়। তাই পর্যায়ক্রমে একক ভ্যাট হারের দিকে যাওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রাথমিক পদক্ষেপে অন্তত সাত-আটটি হার কমিয়ে দুটি হারে নামিয়ে আনা জরুরি।

অন্যদিকে, প্রত্যক্ষ করের ভিত্তি মজবুত করতে ব্যক্তিগত আয়করের হার বাড়ানোর পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়ার মতে, প্রত্যক্ষ করের অবদান ৫০ শতাংশে উন্নীত করতে হলে ব্যক্তিগত আয়করের ভূমিকা বাড়াতে হবে। একই সাথে সম্পদ স্থানান্তরের বিদ্যমান করহার ৫০ শতাংশ হ্রাস করার মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের উৎসাহিত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

বাণিজ্য উদারীকরণ ও রপ্তানি বহুমুখীকরণ

ড. জাইদি সাত্তার তার বক্তব্যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিদ্যমান বাধাগুলো দূর করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশে উচ্চ শুল্কহারের কারণে ভোগ ও বিনিয়োগ—উভয়ই বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের অতি-সুরক্ষার ফলে ব্যবসায়ীরা রপ্তানির চেয়ে স্থানীয় বাজারে পণ্য বিক্রিকে বেশি লাভজনক মনে করছেন। ফলে পোশাক শিল্পের বাইরে বড় কোনো বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি খাত গড়ে উঠছে না।

স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ যাতে বৈশ্বিক বাজারে ‘অ্যান্টি ডাম্পিং’ বা শুল্ক বাধার মুখে না পড়ে, সেজন্য এখনই শুল্ক কাঠামো যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা প্রয়োজন। এছাড়া রিটার্ন জমা না দেওয়ার ফলে জরিমানার বিধান থাকলেও তার সঠিক বাস্তবায়ন না হওয়ার বিষয়টি সংবাদ সম্মেলনে উঠে আসে। এ জন্য একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী তথ্যভাণ্ডার গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়েছেন আইসিএবির ভাইস প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ মেহেদী হাসান।

এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি পাবে, যা বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করবে।