জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

স্মরণে সলঙ্গা বিদ্রোহের অমর নায়ক তর্কবাগীশ

বাংলার রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে কিছু মানুষ তাঁদের সময়কে অতিক্রম করে একটি বৃহত্তর সংগ্রামের প্রতীকে পরিণত হন। মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ছিলেন তেমনই এক জননেতা। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, কৃষকের অধিকার, ভাষার মর্যাদা, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং সাধারণ মানুষের মুক্তির প্রশ্নে তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবন ছিল সংগ্রামমুখর। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান এবং মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নির্ভীক ভূমিকার কারণে তিনি আজও ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছেন।

মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ ১৯০০ সালের ২৭ নভেম্বর সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা উপজেলার তারুটিয়া গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী পীর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা শাহ সৈয়দ আবু ইসহাক এবং মা আজিজুন্নেছা। ধর্মীয় মূল্যবোধ, মানবিকতা ও মানুষের প্রতি দায়িত্ববোধের পরিবেশে তাঁর শৈশব ও কৈশোর কেটেছে। পরবর্তী সময়ে এই মূল্যবোধই তাঁর সামাজিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।

তাঁর জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায়গুলোর একটি ঐতিহাসিক সলঙ্গা বিদ্রোহ। ১৯২২ সালের ২৭ জানুয়ারি ব্রিটিশবিরোধী অসহযোগ আন্দোলন এবং বিদেশি পণ্য বর্জনের আন্দোলন যখন তীব্র হয়ে উঠেছিল, তখন সলঙ্গা হাটে বিপুলসংখ্যক মানুষ সমবেত হন। তৎকালীন ব্রিটিশ পুলিশের সঙ্গে জনতার সংঘর্ষের একপর্যায়ে গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে। এতে বহু মানুষ হতাহত হন। রক্তাক্ত সেই ঘটনা পরবর্তী সময়ে ইতিহাসে ‘সলঙ্গা বিদ্রোহ’ নামে পরিচিতি পায়।

এই ঘটনার সঙ্গে তর্কবাগীশের নেতৃত্বের সম্পর্ক তাঁকে ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম পরিচিত মুখে পরিণত করে। সলঙ্গার সেই প্রতিরোধ তাঁর রাজনৈতিক জীবনের গতিপথেও গভীর ছাপ ফেলে।

এরপর দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তাঁর সক্রিয়তা আরও বিস্তৃত হয়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পাকিস্তানের গণপরিষদেও তিনি বাংলার মর্যাদার প্রশ্নটি দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন। ১৯৫৫ সালের ১২ আগস্ট পাকিস্তানের গণপরিষদে বাংলায় বক্তব্য দেওয়ার মাধ্যমে তিনি একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। মাতৃভাষার অধিকারের পক্ষে তাঁর সেই অবস্থান বাঙালির ভাষাভিত্তিক আত্মপরিচয়ের সংগ্রামে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।

১৯৫৬ থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত তিনি আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। একই সময়ে কৃষক আন্দোলন, খেলাফত আন্দোলন, তেভাগা আন্দোলনসহ বিভিন্ন গণআন্দোলনের সঙ্গে তাঁর সম্পৃক্ততা ছিল। কৃষক ও সাধারণ মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থান ছিল স্পষ্ট। রাজনৈতিক ক্ষমতার চেয়ে মানুষের ন্যায্য অধিকারকে তিনি বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন—তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে এর প্রতিফলন দেখা যায়।

তর্কবাগীশের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল সাধারণ মানুষের মর্যাদা ও অধিকার। ধর্মীয় মূল্যবোধের পাশাপাশি জাতীয় চেতনা, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার তাঁকে স্বতন্ত্র রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করেছিল। সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলালেও মানুষের অধিকার নিয়ে তাঁর অবস্থানে বড় কোনো আপসের নজির পাওয়া যায় না।

দীর্ঘ সংগ্রামী জীবনের অবসান ঘটে ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট। রাতের শেষ প্রহরে তৎকালীন পিজি হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁর মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সমাপ্তি হলেও তাঁর কর্ম ও সংগ্রামের স্মৃতি মুছে যায়নি।

সলঙ্গার রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে বাংলার ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন—দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নানা অধ্যায়ের সঙ্গে মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম জড়িয়ে আছে। মানুষের অধিকার, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তাঁর দৃঢ় অবস্থান তাঁকে ইতিহাসের এক স্মরণীয় চরিত্রে পরিণত করেছে।

তাঁর প্রয়াণদিবসে তাই তাঁকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন রাজনীতিককে স্মরণ করা নয়; বরং বাংলার গণমানুষের অধিকার আদায়ের দীর্ঘ সংগ্রামের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে ফিরে দেখা। সলঙ্গার সেই সাহসী জননেতার নাম ইতিহাসের পাতায় শ্রদ্ধার সঙ্গেই উচ্চারিত হবে—মাওলানা আব্দুর রশিদ তর্কবাগীশ।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর