খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জুন ২০২৬, ১০:৪২ পিএম

খুলনা মহানগরীর খালিশপুরে নিজ ঘর থেকে এক বৃদ্ধার মরদেহ উদ্ধারকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের নাম মমতাজ বেগম (৬৫)। তার শরীরে ও মুখে একাধিক আঘাতের চিহ্ন মেলায় এটি সাধারণ কোনো মৃত্যু নয় বলে ধারণা করছে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দারা। সবচেয়ে বেশি সন্দেহের উদ্রেক হয়েছে যখন নিহতের দুই ছেলে প্রতিবেশীদের সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে তড়িঘড়ি করে মরদেহ দাফন করার চেষ্টা চালান। ঘটনাটি জানাজানি হলে পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে অভিযান চালিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে এবং দুই ছেলেকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়।
গত মঙ্গলবার দিবাগত রাতের কোনো একসময়ে নগরীর খালিশপুরের উত্তর কাশিপুর কবরস্থান রোডের একটি বাড়িতে এই ঘটনা ঘটে। বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, উত্তর কাশিপুর কবরস্থান রোডের ‘ডাক্তার বাড়ি’ নামের ওই বাসায় পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সঙ্গেই বসবাস করতেন মমতাজ বেগম। মঙ্গলবার রাতের আঁধারে নিজ ঘরের ভেতর তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করেন এবং প্রতিবেশীদের কাউকেই রাতে কিছু জানাননি।
বুধবার দুপুরের দিকে মমতাজ বেগমের বড় ছেলে মাসুম এবং ছোট ছেলে, যিনি পেশায় একজন হোমিও চিকিৎসক, মেহেদী হাসান সোহাগ আচমকা জানাজা ও দাফনের প্রস্তুতি শুরু করেন। সাধারণত সমাজে বা এলাকায় কেউ মারা গেলে আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের খবর দেওয়া হয়, মাইকিং করা হয় কিংবা ধর্মীয় রীতিনীতি মেনে সবাইকে শামিল করা হয়। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পুরো প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন করার চেষ্টা চলছিল। ছেলেদের এই অস্বাভাবিক তাড়াহুড়ো ও গোপনীয়তা দেখে আশেপাশের মানুষের মনে খটকা লাগে। সন্দেহ দানা বাঁধলে কিছু প্রতিবেশী ওই বাড়িতে যান এবং মরদেহটি দেখার পর তারা বড় ধরনের ধাক্কা খান।
মরদেহটি দেখার পর প্রতিবেশীরা স্তম্ভিত হয়ে যান। তারা দেখতে পান, বৃদ্ধার চোখ ও মুখ দিয়ে তাজা রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। শুধু তাই নয়, কাপড় সরিয়ে দেখা যায় তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে কালশিটে ও স্পষ্ট আঘাতের দাগ রয়েছে। বার্ধক্যজনিত বা স্বাভাবিক মৃত্যু হলে শরীরে এমন রক্তাক্ত জখম কিংবা মারধরের চিহ্ন থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। এই দৃশ্য দেখার পর এলাকাবাসীর মনে আর কোনো সন্দেহ থাকে না যে, বৃদ্ধার মৃত্যুর পেছনে কোনো অপরাধ লুকিয়ে আছে। এরপর তারা জানাজা ও দাফনের কাজ জোরপূর্বক আটকে দেন এবং সরাসরি খালিশপুর থানায় খবর পাঠান।
খবর পাওয়ার পরপরই খালিশপুর থানা পুলিশের একটি বিশেষ দল দ্রুত ‘ডাক্তার বাড়ি’তে পৌঁছায়। তারা মরদেহটি নিজেদের হেফাজতে নেয় এবং প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পরে মরদেহটি ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। এই সময় ঘটনাস্থল থেকেই নিহতের দুই ছেলে মাসুম ও মেহেদী হাসান সোহাগকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে খুলনা মহানগরীর খালিশপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এস এম জাবীদ হাসান জানান, মমতাজ বেগমের মৃত্যুর পুরো বিষয়টি প্রাথমিকভাবে অত্যন্ত রহস্যজনক এবং সন্দেহভাজন বলে মনে হচ্ছে। নিহতের শরীরে ও মুখে যে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে, তার সুনির্দিষ্ট কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এটি হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কোনো কারণে মৃত্যু, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পেলেই নিশ্চিত হওয়া যাবে। আটক হওয়া দুই ছেলেকে বর্তমানে থানায় রেখে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। এছাড়া পরিবারের অন্য কোনো সদস্য এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত কি না, তাও খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ওসির বক্তব্য অনুযায়ী, নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে বা অন্য কোনো মাধ্যম থেকে লিখিত অভিযোগ আসলে এবং ময়নাতদন্তে হত্যার প্রমাণ মিললে আসামিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঘটনার পর থেকে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে।
মন্তব্য