জিলাইভ [ GLive ] | truth alone triumphs

কেরুর জয়যাত্রা অব্যাহত, রেকর্ড মুনাফা এবারও

চিনি উৎপাদনে বছরের পর বছর লোকসান চললেও অন্যান্য ইউনিটের আয় ও মুনাফায় রাষ্ট্রায়ত্ত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড এবার নতুন রেকর্ড গড়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটি সব ইউনিট মিলিয়ে ১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা কেরুর প্রতিষ্ঠার পর সর্বোচ্চ।

চুয়াডাঙ্গার দর্শনায় অবস্থিত প্রায় ৯০ বছরের পুরোনো এ প্রতিষ্ঠান এর আগের অর্থবছরেও রেকর্ড মুনাফা করেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কেরুর নিট মুনাফা ছিল ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। সেই হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা বেড়েছে ৩৫ কোটি ৭৯ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ আগের বছরের তুলনায় মুনাফা বেড়েছে প্রায় ২৮ শতাংশ।

কেরুর সর্বশেষ আর্থিক হিসাবে দেখা যাচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মুনাফার সবচেয়ে বড় অবদান এসেছে ডিস্টিলারি ইউনিট থেকে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ ইউনিট থেকে লাভ হয়েছে ২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা। এই আয়ই মূলত চিনি উৎপাদন ইউনিটের বড় ধরনের লোকসান সামলে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফাকে রেকর্ড পর্যায়ে নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

অন্যদিকে চিনি কারখানার আর্থিক চিত্র এখনও স্বস্তিদায়ক নয়। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্ভাব্য হিসাবে এ ইউনিটে লোকসান হয়েছে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা। আগের অর্থবছর, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে চিনি বিভাগে লোকসান ছিল ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা। ফলে এক বছরে লোকসান কিছুটা কমলেও তা এখনও ৬০ কোটি টাকার বেশি।

কেরুর বিভিন্ন ইউনিটের আয় ও লোকসানের চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো—

ইউনিট২০২৫-২৬ অর্থবছরের ফলাফল
ডিস্টিলারি২২৩ কোটি ৭৯ লাখ ৩২ হাজার টাকা লাভ
চিনি কারখানা৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকা লোকসান
জৈবসার১ কোটি ৪৭ লাখ ৮৪ হাজার টাকা লাভ
বাণিজ্যিক খামার১ কোটি ৪৮ লাখ ৪ হাজার টাকা লাভ
আকন্দবাড়িয়া ইউনিট৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা লাভ
ডিস্টিলারি ওষুধ ইউনিট৩ লাখ ৭৯ হাজার টাকা লাভ
সব ইউনিটের নিট মুনাফা১৬৫ কোটি ২৪ লাখ ৩১ হাজার টাকা
২০২৪-২৫ সালের নিট মুনাফা১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকা
২০২৩-২৪ সালের নিট মুনাফা১১২ কোটি ৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা
২০২৪-২৫ সালে চিনি বিভাগের লোকসান৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকা
২০২৩-২৪ সালে চিনি বিভাগের লোকসান৬০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা

পরিসংখ্যান বলছে, কেরুর নিট মুনাফা গত কয়েক বছর ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির নিট মুনাফা ছিল ১১২ কোটি ৭ লাখ ৯১ হাজার টাকা। এক বছর পর তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২৯ কোটি ৪৪ লাখ ৭৪ হাজার টাকায়। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা ছাড়িয়ে গেছে ১৬৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ দুই অর্থবছরের ব্যবধানে নিট মুনাফা বেড়েছে ৫৩ কোটি ১৬ লাখ ৪০ হাজার টাকা।

তবে একই সময়ে চিনি উৎপাদন ইউনিটের লোকসানের চিত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন আসেনি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এ বিভাগে লোকসান ছিল ৬০ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। পরের অর্থবছরে তা বেড়ে ৬২ কোটি ৩৫ লাখ টাকায় পৌঁছায়। সর্বশেষ অর্থবছরে লোকসান কিছুটা কমে ৬০ কোটি ১৯ লাখ ৭৩ হাজার টাকায় নেমেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, চিনি কারখানার দীর্ঘদিনের লোকসানের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। পুরোনো যন্ত্রপাতি, আখের মান, কম হারে চিনি আহরণ এবং উৎপাদন ব্যয়ের তুলনামূলক উচ্চ হার এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ার পাশাপাশি উৎপাদিত চিনির বিক্রয় থেকে প্রত্যাশিত আয় না আসায় এ ইউনিটের লোকসান অব্যাহত রয়েছে।

তবে কেরুর ব্যবসার ধরন এখন শুধু চিনি উৎপাদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। ডিস্টিলারি, ওষুধ, জৈবসার, কৃষি খামারসহ বিভিন্ন ইউনিট প্রতিষ্ঠানটির আয়ের ভিত্তি বিস্তৃত করেছে। বিশেষ করে ডিস্টিলারি ইউনিটের বিপুল মুনাফা চিনি কারখানার লোকসান পুষিয়ে সামগ্রিক আর্থিক ফলাফলকে শক্তিশালী করছে।

দর্শনায় কেরু অ্যান্ড কোম্পানির চিনি ও ডিস্টিলারি কারখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৩৮ সালে। শুরুতে দৈনিক ১ হাজার টন আখ মাড়াই এবং ১৮ হাজার প্রুফ লিটার স্পিরিট উৎপাদনের সক্ষমতা নিয়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছিল। সময়ের সঙ্গে এর কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমানে চিনি ও ডিস্টিলারির পাশাপাশি ওষুধ, কৃষি খামার এবং জৈবসার উৎপাদনও প্রতিষ্ঠানটির ব্যবসার অংশ।

কেরু অ্যান্ড কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রাব্বির হাসান জানিয়েছেন, আগের বছরের তুলনায় এবার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ইউনিট থেকে বেশি মুনাফা অর্জন সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে চিনি উৎপাদন ইউনিটের লোকসানও কিছুটা কমেছে। ভবিষ্যতে চিনি উৎপাদন ইউনিটের লোকসান আরও কমিয়ে প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক মুনাফা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও তিনি জানিয়েছেন।

কেরুর সর্বশেষ আর্থিক ফলাফল প্রতিষ্ঠানটির বহুমুখী ব্যবসার শক্তি স্পষ্ট করেছে। একদিকে ডিস্টিলারি ও অন্যান্য লাভজনক ইউনিটের সাফল্যে নিট মুনাফা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, অন্যদিকে চিনি কারখানার দীর্ঘদিনের লোকসান এখনও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে। ফলে রেকর্ড মুনাফার ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে হলে লাভজনক ইউনিটগুলোর কার্যক্রমের পাশাপাশি চিনি উৎপাদনের ব্যয়, উৎপাদন দক্ষতা ও লোকসান কমানোর বিষয়টিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর