পশ্চিমবঙ্গের কয়লা পাচার মামলার তদন্তকে কেন্দ্র করে রাজ্য পুলিশ ও কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যকার সংঘাতের জেরে রাজ্য সরকারের দায়ের করা চারটি এফআইআরের (FIR) ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) বিচারপতি প্রকাশ চন্দ্র মিশ্র ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির সমন্বয়ে গঠিত একটি ডিভিশন বেঞ্চ এই আদেশ প্রদান করেন। আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি এই মামলার পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে এবং ওই সময় পর্যন্ত রাজ্য সরকার ইডি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবে না।
সংঘাতের প্রেক্ষাপট ও আই-প্যাক দপ্তরে তল্লাশি
গত ৮ জানুয়ারি ইডি তৃণমূল কংগ্রেসের নির্বাচনী পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘আই-প্যাক’ (I-PAC)-এর সল্টলেক কার্যালয় এবং এর কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাসভবনে বড় ধরনের তল্লাশি অভিযান চালায়। ইডির অভিযোগ ছিল, কয়লা পাচারের বিপুল পরিমাণ টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে আই-প্যাকের কোষাগারে জমা হয়েছে। তবে এই অভিযানকে ঘিরেই চরম বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। অভিযানের সময় মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নিয়ে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন এবং ইডির কার্যক্রমের তীব্র প্রতিবাদ জানান। পরবর্তীতে ইডি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও নিয়ম ভঙ্গের অভিযোগে কলকাতার দুটি থানায় চারটি মামলা দায়ের করে পশ্চিমবঙ্গ সরকার।
আদালতে ইডির বিস্ফোরক দাবি ও পাল্টা অভিযোগ
সুপ্রিম কোর্টে ইডি অভিযোগ করেছে যে, পশ্চিমবঙ্গে তাদের ওপর রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা হচ্ছে। সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজ্যের বর্তমান পুলিশ মহাপরিচালক (ডিজিপি) রাজীব কুমার এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ ভার্মাকে ব্যবহার করে তল্লাশিস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ ও নথিপত্র সরিয়ে ফেলেছেন। এই কারণে ইডি কর্মকর্তারা কোনো বিধিসম্মত ‘সিজার লিস্ট’ বা জব্দ তালিকা তৈরি করতে ব্যর্থ হন। এই পরিস্থিতিতে ইডি তাদের বিরুদ্ধে করা মামলার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে এবং রাজ্যের বাইরে স্থানান্তরের আবেদন জানিয়েছে।
নিচে ঘটনার প্রধান বিতর্কিত দিকগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিতর্কের ক্ষেত্র | ইডির (ED) অভিযোগ ও দাবি | পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পাল্টাযুক্তি |
| অভিযানের ভিত্তি | কয়লা পাচারের টাকা হাওয়ালার মাধ্যমে আই-প্যাকের হাতে আসার তথ্য। | রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ও কোনো নোটিশ ছাড়াই নজিরবিহীন তল্লাশি। |
| নথি গায়েব | ডিজিপি রাজীব কুমারের সহায়তায় গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সরিয়ে ফেলা হয়েছে। | ইডি তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনী কৌশলের দলিল চুরি করেছে। |
| পুলিশের ভূমিকা | রাজ্য পুলিশকে দিয়ে কেন্দ্রীয় সংস্থাকে হেনস্তা ও মামলা করা হচ্ছে। | ইডি নিয়ম না মেনে দপ্তরে প্রবেশ করায় পুলিশি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। |
| আদালতের অবস্থান | ইডির বিরুদ্ধে হওয়া চারটি মামলার ওপর স্থগিতাদেশ প্রদান। | ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে এফিডেভিট পেশের নির্দেশ। |
বিচারিক পর্যবেক্ষণ ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
সুপ্রিম কোর্ট উভয় পক্ষকে আগামী ৩ ফেব্রুয়ারির মধ্যে হলফনামার মাধ্যমে তাদের বিস্তারিত অবস্থান ও প্রমাণাদি জমা দিতে বলেছে। বিচারপতিরা জানিয়েছেন, তদন্তে কোনো প্রকার রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার পরই মামলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা হবে। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভিযোগ, তল্লাশির নামে ইডি মূলত দলের অত্যন্ত গোপনীয় কৌশলপত্রগুলো হস্তগত করার চেষ্টা করেছে। অন্যদিকে, ইডি সাফ জানিয়েছে যে, সাংবিধানিক পদে থেকে কোনো মুখ্যমন্ত্রী তদন্তের স্থানে ঢুকে নথি সরিয়ে নেওয়া গুরুতর অপরাধ।
এই স্থগিতাদেশের ফলে আপাতত ইডি কর্মকর্তারা সাময়িক স্বস্তি পেলেও কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যকার প্রশাসনিক ও আইনি সংকট চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগামী মাসের শুনানিতে আই-প্যাকের বিরুদ্ধে ওঠা আর্থিক লেনদেনের অভিযোগের সপক্ষে ইডি কী প্রমাণ দেয়, সেটিই এখন বড় দেখার বিষয়।
