ঢাকার চারপাশের চক্রাকার নৌপথে বেসরকারি উদ্যোগে আবারও ওয়াটার বাস চালুর পরিকল্পনা করছে সরকার। নগরবাসীর যাতায়াতের বিকল্প ব্যবস্থা তৈরির পাশাপাশি নদীকেন্দ্রিক পর্যটন ও বিনোদনের সুযোগ বাড়ানোই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য বলে জানিয়েছেন সড়ক ও নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম।
রোববার (২ আগস্ট) সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ পরিকল্পনার কথা জানান। মন্ত্রী বলেন, আগামী দুই মাসের মধ্যে ওয়াটার বাস চালুর বিষয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হবে। এরপর বেসরকারি উদ্যোক্তাদের সম্পৃক্ত করে ধাপে ধাপে ঢাকার চক্রাকার নৌপথে এই সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সরকারের পরিকল্পনার আওতায় আশুলিয়া থেকে সদরঘাট হয়ে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত নৌপথকে যাত্রী পরিবহনের জন্য কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে। তবে পুরো রুট এখনো সমানভাবে ব্যবহারোপযোগী নয়। নৌপথের কিছু অংশে যাতায়াতের সম্ভাবনা থাকলেও কোথাও কোথাও নাব্যতা, নদীদূষণ, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং নিচু সেতুর মতো প্রতিবন্ধকতা রয়েছে।
মন্ত্রী বলেন, দীর্ঘ নৌপথে যাত্রী আকৃষ্ট করা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সড়কপথে অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সময়ে গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব। ফলে শুধু বিকল্প গণপরিবহন হিসেবে ওয়াটার বাস চালু করলেই যাত্রী পাওয়া যাবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। যাত্রীদের কাছে নৌপথকে কার্যকর ও আকর্ষণীয় করে তুলতে সময়নিষ্ঠ সেবা, পর্যাপ্ত সংখ্যক নৌযান এবং নির্ভরযোগ্য যাতায়াতব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
এর আগে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি) ঢাকার চক্রাকার নৌপথে ওয়াটার বাস পরিচালনা করেছিল। তবে দীর্ঘ সময় ধরে সেবাটি প্রত্যাশিত যাত্রী আকর্ষণ করতে পারেনি। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, যাত্রীস্বল্পতা, নদীদূষণ এবং পরিচালন ব্যয়ের কারণে গত ১০ বছরে এ খাতে বিআইডব্লিউটিসির প্রায় ৫৭ কোটি টাকা লোকসান হয়েছে। একপর্যায়ে ওয়াটার বাস সেবা বন্ধ হয়ে যায়।
নতুন উদ্যোগে সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। শেখ রবিউল আলম জানান, কয়েকজন বেসরকারি উদ্যোক্তা ইতোমধ্যে ওয়াটার বাস পরিচালনায় আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের পরিকল্পনায় শুধু যাত্রী পরিবহন নয়, নদীকে ঘিরে পর্যটন ও বিনোদনের সম্ভাবনাকেও কাজে লাগানোর বিষয়টি রয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে নৌপথটি কেবল দৈনন্দিন যাতায়াতের মাধ্যম না হয়ে নগরবাসীর অবসর কাটানোর একটি আকর্ষণীয় ক্ষেত্র হিসেবেও গড়ে উঠতে পারে।
তবে যাত্রীসেবা কার্যকর করতে নৌযানের সংখ্যা যথেষ্ট রাখতে হবে। মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ রুটে যাত্রীদের আস্থা তৈরি করতে ১৫ থেকে ২০ মিনিট পরপর ওয়াটার বাস চালানোর প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু এত ঘন ঘন নৌযান পরিচালনা করলে জ্বালানি, জনবল, রক্ষণাবেক্ষণসহ সামগ্রিক পরিচালন ব্যয়ও বেড়ে যাবে। তাই সেবাটি চালুর আগে এর বাণিজ্যিকভাবে টেকসই মডেল তৈরি করাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
নদীদূষণকে এ প্রকল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন মন্ত্রী। তাঁর মতে, নদীর পানি ও পরিবেশ দূষিত থাকলে সাধারণ মানুষ নৌপথে যাতায়াত বা বিনোদনের জন্য আগ্রহী হবেন না। তাই শুধু ওয়াটার বাস চালু করাই যথেষ্ট নয়; একই সঙ্গে নদী পরিষ্কার রাখা, দুই তীরের পরিবেশ উন্নয়ন এবং নৌপথকে নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে তোলার কাজও করতে হবে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে প্রয়োজনীয় দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
নৌপথের অবকাঠামোগত প্রতিবন্ধকতাও গুরুত্ব পাচ্ছে। টঙ্গীর রেলসেতুসহ কয়েকটি স্থানে নিচু সেতুর কারণে ওয়াটার বাস চলাচলে সমস্যা হতে পারে। মন্ত্রী জানান, সড়ক সেতুর উচ্চতা নৌযান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করলে প্রয়োজন অনুযায়ী তা উঁচু করার পরিকল্পনা নেওয়া যেতে পারে। তবে রেলসেতুর ক্ষেত্রে ভিন্ন ব্যবস্থা বিবেচনা করা হচ্ছে। সম্ভাব্য সমাধান হিসেবে কোনো কোনো স্থানে যাত্রীদের এক পাশ থেকে নেমে সেতু পার হয়ে অন্য পাশে গিয়ে আবার ওয়াটার বাসে ওঠার ব্যবস্থা করা হতে পারে।
আগের ওয়াটার বাস প্রকল্পে বিআইডব্লিউটিসির বড় অঙ্কের লোকসানের কারণও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, যাত্রীসংখ্যা কম থাকা, নদীদূষণ এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক নৌযান নিয়মিত পরিচালনা করতে না পারা ছিল সেই ব্যর্থতার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম। নতুন উদ্যোগে এসব সীমাবদ্ধতা দূর করার চেষ্টা করা হবে।
এ প্রকল্পের জন্য আপাতত আলাদা কোনো বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়নি বলেও জানিয়েছেন শেখ রবিউল আলম। সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো নিজ নিজ দায়িত্ব অনুযায়ী প্রাথমিক কাজ এগিয়ে নেবে। পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজন দেখা দিলে বাজেট বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাজের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ঢাকার যানজট কমাতে নৌপথকে গণপরিবহনের বিকল্প হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা নতুন নয়। তবে আগের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় এবার সেবাটিকে আর্থিকভাবে টেকসই করা, পর্যাপ্ত যাত্রী নিশ্চিত করা এবং নদীর পরিবেশ উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে ঢাকার চক্রাকার নৌপথে ওয়াটার বাস নগরবাসীর জন্য নতুন একটি যাতায়াতের সুযোগ তৈরি করতে পারে।









