খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জুন ২০২৬, ৭:৫২ পিএম

গাজীপুর জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় মায়ের অতিরিক্ত স্নেহ ও আদর থেকে বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ থেকে আড়াই বছরের এক কন্যাসন্তানকে বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে ১৪ বছর বয়সী এক বাড়ির মালিকের মেয়ের বিরুদ্ধে। পুলিশি হেফাজতে নিয়ে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অভিযুক্ত কিশোরী এই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেছে। পুলিশ জানায়, শিশুটির মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর অভিযুক্ত কিশোরী নিজেই থানায় গিয়ে আত্মসমর্পণ করে এবং অপরাধের কথা জানায়। তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নবম শ্রেণির এই শিক্ষার্থী দীর্ঘদিন ধরে অপরাধভিত্তিক টেলিভিশন ধারাবাহিক ‘ক্রাইম পেট্রোল’-এর প্রতি প্রবলভাবে আসক্ত ছিল।
নিহত শিশু আরিশা আক্তার জান্নাত রাজবাড়ী জেলার রামকান্তপুর এলাকার বাসিন্দা আলহাজ শেখ ও গোলাপি বেগম দম্পতির মেয়ে। আলহাজ শেখ পেশাগত কারণে পরিবারসহ গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকায় আবুল কালামের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন এবং স্থানীয় সেভেন রিংস সিমেন্ট কারখানায় কর্মরত আছেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত ১৪ বছর বয়সী কিশোরী ওই বাড়ির মালিক আবুল কালামের মেয়ে এবং স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পুলিশ ও নিহত শিশুর পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, ভাড়াটিয়া ও বাড়ির মালিকের দুই পরিবারের মধ্যে অত্যন্ত বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। অভিযুক্ত কিশোরীর মা ছোট শিশু আরিশাকে বিশেষভাবে পছন্দ করতেন এবং তাকে অত্যন্ত স্নেহ ও আদর করতেন। তবে নিজের মায়ের এই অতিরিক্ত আদর ও ভালোবাসা অন্য একটি শিশুর প্রতি প্রকাশ করাটা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছিল না অভিযুক্ত কিশোরী। নিজের মায়ের কাছ থেকে অবহেলিত হওয়ার এই কাল্পনিক ক্ষোভ ও তীব্র মানসিক হতাশা থেকেই সে শিশু আরিশার প্রতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে।
গত শনিবার বিকেলে কালীগঞ্জ পৌরসভার দেওপাড়া এলাকার ওই বাড়ির উঠানে শিশু আরিশা এবং অভিযুক্ত কিশোরী একসঙ্গে খেলছিল। ওই সময় দুই পরিবারের প্রাপ্তবয়স্ক সদস্যরা ঘরের ভেতরে নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায় ব্যস্ত ছিলেন। কিছুক্ষণ পর উঠানে আরিশাকে দেখতে না পেয়ে তার বাবা-মা তাকে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ির গোসলখানায় (বাথরুম) ঢুকে একটি পানির বালতির ভেতর আরিশাকে ডুবন্ত অবস্থায় উদ্ধার করেন তার বাবা-মা। তাদের চিৎকার শুনে আশেপাশের লোকজন ছুটে আসেন এবং শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করে কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক আরিশার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্ত কিশোরী নিজেও হাসপাতালে গিয়ে আরিশার শারীরিক অবস্থার খোঁজখবর নেয়। যখন সে চিকিৎসকদের মাধ্যমে আরিশার মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হয়, তখন সে সরাসরি কালীগঞ্জ থানায় গিয়ে ডিউটি অফিসারের সামনে অপরাধ স্বীকার করে। সে পুলিশকে বলে, “আমি নিজেই আরিশাকে গোসলখানার বালতির পানিতে চুবিয়ে হত্যা করেছি।” এরপর পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয়।
ঘটনার সময়রেখা, মামলার বিবরণ ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর তথ্য নিচে টেবিলের মাধ্যমে সংক্ষেপে উপস্থাপন করা হলো:
| হত্যাকাণ্ডের মূল সূচক ও বিবরণ | সংশ্লিষ্ট সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ফ্যাক্টস |
| নিহত শিশুর পরিচয় | আরিশা আক্তার জান্নাত (বয়স: আড়াই বছর) |
| অভিযুক্তের পরিচয় | বাড়ির মালিকের মেয়ে (বয়স: ১৪ বছর, ৯ম শ্রেণির শিক্ষার্থী) |
| ঘটনার স্থান | দেওপাড়া এলাকা, কালীগঞ্জ পৌরসভা, গাজীপুর |
| ঘটনার তারিখ ও সময় | ২০ জুন, ২০২৬ (শনিবার বিকেল) |
| আইনি পদক্ষেপের তারিখ | ২১ জুন, ২০২৬ (রোববার সকালে হত্যা মামলা দায়ের) |
| মামলার বাদী | আলহাজ শেখ (নিহত শিশুর পিতা) |
| তদন্তকারী থানা | কালীগঞ্জ থানা, গাজীপুর জেলা |
| আদালতের নির্দেশ | গাজীপুর আদালত কর্তৃক অভিযুক্ত কিশোরীকে হাজতবাসে প্রেরণ |
| অভিযুক্তের মানসিক অবস্থা | মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ নয় এবং টেলিভিশন ধারাবাহিকে আসক্ত |
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহত শিশু আরিশার বাবা আলহাজ শেখ আজ রোববার সকালে বাদী হয়ে কালীগঞ্জ থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলার পর দুপুরে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ অভিযুক্ত কিশোরীকে গাজীপুর আদালতে প্রেরণ করে। আদালতের বিচারক তার বয়স ও অপরাধের গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে হাজতবাসে (কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্র বা সংশোধনাগার) প্রেরণের নির্দেশ দেন।
কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেন এবং পরিদর্শক (তদন্ত) আশরাফুল ইসলাম সংবাদমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত কিশোরী মানসিকভাবে সম্পূর্ণ সুস্থ নয় বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। তার নিজের দেওয়া স্বীকারোক্তি এবং পারিপার্শ্বিক আলামত অনুযায়ী সে-ই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে। তবে মায়ের আদর বঞ্চিত হওয়ার ক্ষোভ এবং ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখার আসক্তি ছাড়াও এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পেছনে অন্য কোনো পারিবারিক বিবাদ বা প্ররোচনা রয়েছে কি না, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখছে পুলিশ।
মন্তব্য