ঢাকার যানজট নিরসন ও আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম দুটি ভিত্তিপ্রস্তর—এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প এখন চরম আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুমোদিত এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মেট্রোরেল প্রকল্পের মোট ব্যয় এক ধাক্কায় আরও ১ লাখ ২১ হাজার ৪২৪ কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রকল্প দুটিতে ‘অতিরিক্ত ব্যয়’ ও ‘নিয়মবহির্ভূত উচ্চ দরপ্রস্তাবের’ অভিযোগ এনে ঠিকাদার নিয়োগসহ মূল বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া স্থগিত করা হয়। উদ্দেশ্য ছিল দর পুনর্মূল্যায়ন করে রাষ্ট্রের টাকা সাশ্রয় করা। তবে দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পর দেখা যাচ্ছে, ব্যয় কমানোর সেই সিদ্ধান্তই উল্টো বিশাল অঙ্কের অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা তৈরি করেছে।
Table of Contents
স্থগিতকরণের খেসারত ও বর্তমান অর্থনৈতিক হিসাব
| বিবরণ / সূচক | এমআরটি লাইন-১ | এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) |
| প্রকল্পের ধরন | বিমানবন্দর-কমলাপুর (ভূগর্ভস্থ) ও নতুনবাজার-পূর্বাচল (উড়াল) | হেমায়েতপুর-ভাটারা (ভূগর্ভস্থ ও উড়াল) |
| মোট দৈর্ঘ্য | ৩১.২৪ কিলোমিটার | ২০.০০ কিলোমিটার |
| স্টেশন সংখ্যা | ১৯টি (১২টি ভূগর্ভস্থ, ৭টি উড়াল) | ১৪টি (৯টি ভূগর্ভস্থ, ৫টি উড়াল) |
| মূল অনুমোদিত ব্যয় | ৫২,৫৬১.৪৩ কোটি টাকা | ৪১,২৩৮.৫৫ কোটি টাকা |
| জাপানি ঋণ (JICA) | ৩৯,৪৫০ কোটি টাকা (প্রায়) | ২৯,১২১ কোটি টাকা (প্রায়) |
| জি ও বি অর্থায়ন | ১৩,১১১ কোটি টাকা (প্রায়) | ১২,১১৭ কোটি টাকা (প্রায়) |
| মূল বাস্তবায়ন মেয়াদ | সেপ্টেম্বর ২০১৯ – ডিসেম্বর ২০২৬ | জুলাই ২০১৯ – ডিসেম্বর ২০২৮ |
| প্রস্তাবিত নতুন মেয়াদ | ডিসেম্বর ২০৩৫ পর্যন্ত | ডিসেম্বর ২০৩৪ পর্যন্ত |
| প্রারম্ভিক বিনিময় হার | ১ ডলার = ৮৫.০০ টাকা (২০১৯) | ১ ডলার = ৮৪.৫০ টাকা (২০১৯) |
| বর্তমান হিসাবের বিনিময় হার | ১ ডলার = ১২৩.৮২ টাকা | ১ ডলার = ১২৩.৮২ টাকা |
| টাকার অবমূল্যায়ন | আনুমানিক ৪৬.৫৩% | আনুমানিক ৪৬.৫৩% |
| ঠিকাদারদের প্রাথমিক প্রস্তাব | ৯৬,০০০ কোটি টাকা (বিভিন্ন প্যাকেজে) | প্রাক্কলনের চেয়ে ২ থেকে ৩ গুণ বেশি |
বিনিময় হারের ধাক্কা ও বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি
প্রকল্পের ব্যয় লাফিয়ে বাড়ার প্রধানতম কারণ টাকার মারাত্মক অবমূল্যায়ন। ২০১৯ সালে প্রকল্প দুটি যখন অনুমোদিত হয়, তখন প্রতি মার্কিন ডলারের দর ধরা হয়েছিল ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা থেকে ৮৫ টাকা। কিন্তু বর্তমানে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ডলারের দর হিসাব করা হয়েছে ১২৩ টাকা ৮২ পয়সা। অর্থাৎ, বৈদেশিক মুদ্রায় প্রকল্পের খরচ যদি এক সেন্টও না বাড়ে, কেবল বিনিময় হারের পার্থক্যের কারণেই টাকায় খরচ বাড়ছে সাড়ে ৪৬ শতাংশের বেশি।
মেট্রোরেলের মতো মেগা প্রকল্পে ব্যবহৃত প্রযুক্তির সিংহভাগই আমদানিনির্ভর। রেলগাড়ি, সংকেতব্যবস্থা, তড়িৎ-যান্ত্রিক যন্ত্রাংশ ও ভারী নির্মাণ সামগ্রী বিদেশ থেকে কিনতে হয়। ২০১৯ সালের পর বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারির ধাক্কা এবং পরবর্তীতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে বড় সংকট তৈরি হয়। একই সঙ্গে দেশীয় বাজারে রড, সিমেন্ট, পাথর ও জ্বালানির মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পাওয়ায় পুরোনো প্রাক্কলনের সাথে বর্তমান বাজারদরের বিশাল ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
কেন স্থগিত করা হয়েছিল প্রক্রিয়া?
২০২৪ সালের দ্বিতীয়ার্ধে যখন প্রকল্প দুটির বিভিন্ন প্যাকেজে দরপত্র মূল্যায়ন চলছিল, তখন দেখা যায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলোর হাঁকানো দর সরকারি প্রাক্কলনের চেয়ে অনেক বেশি। এমআরটি লাইন-১-এর মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ৫২,৫৬১ কোটি টাকা, অথচ দরপত্র শেষে বিভিন্ন প্যাকেজের সম্মিলিত হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৯৬,০০০ কোটি টাকা। অন্যদিকে এমআরটি লাইন-৫-এর ৩,৪৪৩ কোটি টাকার একটি ভূগর্ভস্থ প্যাকেজে সর্বনিম্ন দরপ্রস্তাব আসে ১১,১৭৮ কোটি টাকা।
উচ্চ দরপ্রস্তাবকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার দরপত্র প্রক্রিয়া পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তবে নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রক্রিয়ায় কোনো নির্দিষ্ট দুর্নীতি বা অর্থ আত্মসাতের প্রমাণ মেলেনি; কেবল প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে ঠিকাদারদের চাওয়া দর বেশি হওয়ায় কাজটি স্থগিত রাখা হয়।
সিদ্ধান্ত বনাম বাস্তবতা: অর্থনৈতিক ফল কী?
প্রকল্পের প্রক্রিয়া থামিয়ে রেখে দর কমানোর যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, সময়ক্ষেপণের কারণে তা হবুচন্দ্র রাজার সিদ্ধান্তের মতো বিপরীতমুখী প্রভাব ফেলেছে। দরপত্র ঝুলিয়ে রাখার এই দুই বছরে ডলারের দর আরও বেড়েছে এবং বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বহাল রয়েছে। উপরন্তু, ভূগর্ভস্থ ও জটিল অবকাঠামো নির্মাণের ঝুঁকি বিবেচনায় ঠিকাদাররা দীর্ঘমেয়াদি অনিশ্চয়তা কাটাতে দরপত্রে অতিরিক্ত প্রিমিয়াম যোগ করছে।
এমআরটি লাইন-১-এর নির্ধারিত মেয়াদ ২০২৬ সালে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ভৌত কাজ শুরু করতেই ২০২৩ সাল গড়িয়ে যায়, যা এখন ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। এমআরটি লাইন-৫-এর মেয়াদও ২০২৮ থেকে বাড়িয়ে ২০৩৪ সাল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সময় বাড়ার সাথে সাথে কেবল নির্মাণসামগ্রীর দামই বাড়েনি, বরং তদারকি, পরামর্শক ফিস ও প্রশাসনিক পরিচালন ব্যয়ও প্রতি বছর বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে। রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পর্যালোচনার নামে যে বিলম্ব হলো, তাতে আদৌ কত টাকা সাশ্রয় সম্ভব হয়েছে আর বিনিময় হার ও সময়ক্ষেপণের কারণে কত হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত গচ্চা গেল—সেই গাণিতিক হিসাব প্রকাশ করা এখন জরুরি হয়ে পড়েছে।









