খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩০ই জুন ২০২৬, ৫:৪৫ পিএম

ভেনেজুয়েলায় আঘাত হানা সাম্প্রতিক স্মরণকালের ভয়াবহ জোড়া ভূমিকম্পে কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে রাজধানী কারাকাসের নিকটবর্তী উপকূলীয় অঙ্গরাজ্য লা গুয়াইরা। দুর্যোগের তীব্রতা এতই বেশি যে, একেকটি বহুতল আবাসিক এলাকা মুহূর্তের মধ্যে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। চারদিকে এখন শুধু স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদ আর লাশের গন্ধ। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ইতিমধ্যে মৃতের সংখ্যা ১ হাজার ৭০০ ছাড়িয়ে গেছে। হাসপাতালগুলোতে তিল ধারণের জায়গা না থাকায় এই বিধ্বস্ত বন্দরনগরীর একটি খোলা এলাকাকে রূপান্তর করা হয়েছে অস্থায়ী মর্গে।
সেখানকার তপ্ত রোদের মধ্যে নীল রঙের গাউন ও ক্যাপ পরা ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা সারিবদ্ধভাবে রাখা কালো ব্যাগে মোড়ানো মরদেহগুলো একে একে পরীক্ষা করে দেখছেন। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে মরদেহের ব্যাগ ও কফিন। তীব্র গরমে কিছু মরদেহের পচনপ্রক্রিয়া ধীর করতে উপর দিয়ে চুন ছিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। একটি সাদা তাঁবুর পাশে সারি করে রাখা হয়েছে প্রায় ১০০টি খালি পাত্র, যেখানে মরদেহ দাহ করার পর মৃত ব্যক্তিদের চিতাভস্ম বা অস্থি সংরক্ষণ করা হবে।
এই নরককুণ্ডের মাঝে প্রিয়জনদের মরদেহ শনাক্ত করার জন্য ডাক পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন ২৫ বছর বয়সী উইলকার মোল্লালা। আন্তর্জাতিক এক সংবাদমাধ্যমে তিনি বলেন, “আমার পরিবারের সদস্যরা ভেতরে আছে। আমাকে বলা হয়েছে, আমার বোন ও তাঁর সন্তানেরা সেখানে আছে। আমার ভাইয়ের সন্তানেরাও আছে।” ভূমিকম্পের সময় কর্মস্থলে থাকায় তাঁর ১১ সদস্যের পরিবারের মধ্যে এখন শুধু তিনি এবং তাঁর ভাই বেঁচে আছেন।
নিজেদের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে কেউ হাতে ফুলের তোড়া নিয়ে স্বজনের মরদেহ শনাক্ত করতে, আবার কেউ শেষকৃত্যের জন্য লাশ গ্রহণ করতে মর্গে আসছেন। তবে উদ্ধারকাজের ধীরগতি নিয়ে ক্ষুব্ধ অনেকেই দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকার কড়া সমালোচনা করছেন। ক্ষতিগ্রস্ত অনেক এলাকায় মানুষ এখনো কোনো রকম আধুনিক যন্ত্রপাতি ছাড়াই সম্পূর্ণ খালি হাতে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আটকে পড়া স্বজনদের কাছে পৌঁছানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছেন।
এখানেই দেখা মেলে ৪১ বছর বয়সী অ্যান্থনি মারকানোর, যিনি ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে নিজের মেয়ের মরদেহ উদ্ধারের কাজেও সরাসরি অংশ নিয়েছিলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর মেয়ের সন্ধান পেয়ে তিনি বলেন, “গতকাল এসেছিলাম। চারদিকে ঘুরেও মেয়েকে খুঁজে পাইনি। আজ আবার এলাম। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ, আমি ওকে পেয়েছি। আমি ওকে শনাক্ত করতে পেরেছি।” পোশাক আর হাতে থাকা আংটি ছাড়া বিকৃত হয়ে যাওয়া মরদেহটি চেনার আর কোনো উপায় ছিল না। মারকানো অশ্রুসিক্ত চোখে জানান, মেয়েকে তিনি একটি আংটি উপহার দিয়েছিলেন, আর সেই চিরচেনা আংটি দেখেই তিনি নিজের কলিজার টুকরোকে চিনে নিয়েছেন।
কত মানুষ এখনো নিখোঁজ বা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে, সে বিষয়ে সরকারিভাবে নির্দিষ্ট কোনো হিসাব দেওয়া হয়নি। তবে জাতিসংঘের ধারণা অনুযায়ী, এখনো প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তা আন্দাজ করা যায় একটি তথ্যেই—সংস্থাটি জরুরি সহায়তার অংশ হিসেবে কেবল ১০ হাজার মরদেহের ব্যাগ পাঠাচ্ছে।
এমন চরম বিপদের দিনে ভেনেজুয়েলাজুড়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অভূতপূর্ব সংহতির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। দেশের অনেক বেসরকারি শেষকৃত্য পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে মরদেহ বহনের গাড়ি সরবরাহ করছে এবং দাহ করার যাবতীয় ব্যবস্থা করে দিচ্ছে। ৩৭ বছর বয়সী ডারউইন সিলভাও এসেছিলেন তাঁর মায়ের মরদেহ নিতে, যিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট হুগো চাভেজের সময় নির্মিত একটি সামাজিক আবাসন প্রকল্পে বসবাস করতেন। গভীর রাতে একটি ভেঙে পড়া বিমের নিচ থেকে তাঁর মায়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নিজের গভীর শোক সামলে নিয়ে অ্যান্থনি মারকানো অন্য পরিবারগুলোকে সান্ত্বনা দিয়ে বলছেন, ঈশ্বরের কাছে অন্তত এই প্রার্থনাই করুন, যেন এই ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও আপনার প্রিয়জনকে মর্যাদার সঙ্গে শেষবিদায় জানাতে পারেন।
মন্তব্য