ক্রিমিয়া রাশিয়ার হাতে ছেড়ে দিয়ে শান্তিচুক্তি করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভে ভয়াবহ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে রাশিয়া। এতে অন্তত দুইজন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিৎসকো।
বৃহস্পতিবার ভোরে শহরজুড়ে ড্রোনের গমগম শব্দে কেঁপে ওঠে কিয়েভ। আতঙ্কিত বাসিন্দারা আশ্রয়কেন্দ্রে ছুটে যান। মেয়র ক্লিৎসকো জানান, আহতদের মধ্যে ৩৮ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে, যাদের মধ্যে ছয়জন শিশু রয়েছে।
একই দিনে পূর্ব ইউক্রেনের খারকিভ শহরেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়। শহরের মেয়র ইগর তেরেখোভ সতর্ক করে বলেন, ‘শহরের ওপর বড় ধরনের ড্রোন হামলা চলছে।’
এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, রাশিয়ার সঙ্গে শান্তিচুক্তি কার্যত সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি এতে রাজি হচ্ছেন না। ট্রাম্প অভিযোগ করে বলেন, জেলেনস্কি শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো আরও কঠিন করে তুলছেন, যা যুদ্ধের মেয়াদ বাড়িয়ে দেবে।
ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করেছি। এখন শুধু জেলেনস্কির সঙ্গে বোঝাপড়া করতে হবে। ভেবেছিলাম, তা সহজ হবে — কিন্তু হয়নি।’
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও জানান, ওয়াশিংটনের প্রস্তাব অনুযায়ী শান্তিচুক্তির অর্থ হলো ক্রিমিয়াসহ যেসব ইউক্রেনীয় ভূখণ্ড রাশিয়ার দখলে আছে, সেগুলোর নিয়ন্ত্রণ মেনে নেওয়া। তবে জেলেনস্কি একে সংবিধান লঙ্ঘন হিসেবে প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এ বিষয়ে ট্রাম্প ট্রুথ সোশালে লেখেন, ‘জেলেনস্কি চাইলে শান্তি পেতে পারে, অথবা তিন বছর ধরে যুদ্ধ চালিয়ে গোটা দেশ হারাতে পারে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ক্রিমিয়া বহু আগেই হারানো হয়েছে। এটা আলোচনার বিষয় নয়।’
জবাবে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ২০১৮ সালের যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও-র ‘ক্রিমিয়া ঘোষণা’ পোস্ট করেন, যেখানে রাশিয়ার ক্রিমিয়া দখলের প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যানের কথা বলা হয়েছিল।
রুশ হামলার মধ্যে জেলেনস্কির উপদেষ্টা আন্দ্রি ইয়ারমাক জানিয়ে দেন, একযোগে কিয়েভ, খারকিভসহ বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে রাশিয়া। তিনি বলেন, ‘পুতিনের একমাত্র লক্ষ্য— হত্যা। এই আগুন থামাতে হবে।’
এদিকে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলিন লেভিট জানান, শান্তিচুক্তি প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই ট্রাম্প প্রচণ্ড বিরক্ত হয়েছেন। বারবার প্রচারণায় বলা ট্রাম্পের সেই ঘোষণা, ‘২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ শেষ করবেন’ — সেটার চাপ এখন ইউক্রেনের ওপর পড়ছে।
তবে রাশিয়ার ওপর কোনো বড় চাপ দেননি ট্রাম্প। বরং যুদ্ধ বন্ধ হলে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
ভারত সফরে গিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনায় যুদ্ধবিরতির অর্থ হবে বর্তমান সীমান্ত রেখাই স্থির রাখা। এর মানে ইউক্রেনের একটি বড় অংশ রাশিয়ার দখলে থেকে যাবে। তবে রাশিয়া কী বিনিময়ে ছাড় দেবে, সে বিষয়ে কিছু বলেননি তিনি।
ওয়াশিংটন যদি ক্রিমিয়ার দখল স্বীকার করে নেয় — এই সম্ভাবনায় ইউরোপীয় নেতারাও উদ্বেগ জানাচ্ছেন। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁর দফতর জানায়, ‘ইউক্রেনের ভূখণ্ড অখণ্ডতা এবং ইউরোপের নিরাপত্তা — এই দুটি বিষয় আমাদের কাছে অতি গুরুত্বপূর্ণ।’ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ের স্টারমারও জানান, ‘ইউক্রেনের ভবিষ্যৎ ঠিক করবে ইউক্রেনই।’
এদিকে লন্ডনে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, জার্মানি ও ব্রিটেনের সঙ্গে বৈঠক শেষ করেছে ইউক্রেনের একটি প্রতিনিধি দল। মার্কিন প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এই সপ্তাহেই মস্কো সফরে যাবেন। ট্রাম্পও মধ্যপ্রাচ্য সফর শেষে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাতের ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে ইস্টার উপলক্ষে স্বল্প সময়ের যুদ্ধবিরতি ভেঙে দক্ষিণ-পূর্ব ইউক্রেনের মারগানেতস শহরে রাশিয়া নতুন করে বিমান হামলা চালায়। এতে নয়জন নিহত এবং অন্তত ৩০ জন আহত হন।
ঘটনার পর প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি ‘তাৎক্ষণিক, পূর্ণাঙ্গ ও নিঃশর্ত যুদ্ধবিরতির’ আহ্বান জানান।
