মধ্যপ্রাচ্যে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান ধমনী ‘হরমুজ প্রণালী’ পুনরায় সুরক্ষিত করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নতুন ও কৌশলগত শান্তি প্রস্তাব দিয়েছে ইরান। তেহরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সমাপ্তি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত করতে বদ্ধপরিকর। তবে এই প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়—ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনাকে আপাতত স্থগিত রাখার শর্ত দেওয়া হয়েছে। সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওস এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই কূটনৈতিক তৎপরতার তথ্য প্রকাশ করে।
Table of Contents
কূটনৈতিক তৎপরতা ও প্রস্তাবের নেপথ্য
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদন অনুসারে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সম্প্রতি পাকিস্তান সফরকালে এই নতুন পরিকল্পনার রূপরেখাটি প্রকাশ করেন। তিনি ইসলামাবাদে মধ্যস্থতাকারী দেশসমূহ—পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক এবং কাতারের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে এই প্রস্তাবটি ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, আরাগচি স্বীকার করেছেন যে ওয়াশিংটনের পারমাণবিক দাবিগুলো মোকাবিলার বিষয়ে ইরানের অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের মধ্যে এখনও কোনো সুনির্দিষ্ট ঐকমত্য হয়নি। মূলত এই অভ্যন্তরীণ মতভেদ এবং আলোচনায় গতি আনার লক্ষ্যেই তেহরান পারমাণবিক ইস্যুকে সরিয়ে রেখে নিরাপত্তা ও বাণিজ্যিক স্থিতিশীলতাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
ইরানের তিন ধাপের প্রস্তাবিত রূপরেখা
পাকিস্তান ও ওমানের মধ্যস্থতায় হোয়াইট হাউসে পাঠানো ইরানের এই নতুন পরিকল্পনাটি তিনটি প্রধান ধাপে বিভক্ত। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধাপগুলো সফল হলে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান নিরাপত্তা কাঠামোতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে।
প্রথম ধাপ (নিরাপত্তা নিশ্চয়তা): ইরান দাবি করেছে যে, তাদের রাষ্ট্রীয় সীমানা এবং লেবাননের ওপর ভবিষ্যতে আর কোনো সামরিক আক্রমণ চালানো হবে না—এমন একটি আন্তর্জাতিক আইনি নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে। এর বিনিময়ে তারা সশস্ত্র সংঘাত বন্ধে পূর্ণ সহযোগিতা করবে।
দ্বিতীয় ধাপ (হরমুজ প্রণালী ও অবরোধ মুক্তি): বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ খনিজ তেল পরিবহনের পথ হরমুজ প্রণালী পরিচালনার জন্য ওমানের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নতুন আইনি কাঠামো তৈরির প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এর বিনিময়ে ইরানের ওপর আরোপিত মার্কিন অর্থনৈতিক অবরোধগুলো পুরোপুরি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।
তৃতীয় ধাপ (পারমাণবিক আলোচনা): উপরোক্ত দুটি ধাপ সফলভাবে বাস্তবায়িত হওয়ার পর এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্থিতিশীলতা ফিরে এলে তৃতীয় পর্যায়ে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করা হবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্র অবিলম্বে কর্মসূচি বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে, ইরান সেখানে এই ইস্যুটিকে আলোচনার সর্বশেষ ধাপে রেখেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও কৌশলগত গুরুত্ব
ইরানের এই নতুন প্রস্তাবে ওমানকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি কূটনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। হরমুজ প্রণালীর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ওমান ও ইরানের যৌথ ব্যবস্থাপনা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম। তবে ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ হলো ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। তেহরান তাদের কর্মসূচিকে ‘শান্তিপূর্ণ’ বলে দাবি করলেও ওয়াশিংটনের আশঙ্কা ইরান গোপনে পারমাণবিক মারণাস্ত্র তৈরির সক্ষমতা অর্জন করছে। ফলে পারমাণবিক ইস্যুকে স্থগিত রেখে শুধুমাত্র বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে আলোচনায় বসা বাইডেন প্রশাসনের জন্য একটি জটিল মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক পরীক্ষা।
ভবিষ্যৎ গতিপথ ও মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা
মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিরসনে বর্তমানে পাকিস্তান, মিসর, তুরস্ক এবং কাতার নিবিড়ভাবে কাজ করছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এবং গালফ নিউজ-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোয়াইট হাউস ইরানের এই প্রস্তাবটি গুরুত্বের সাথে পর্যালোচনা করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রস্তাবটি মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী শান্তি ফেরানোর একটি বড় সুযোগ হতে পারে, যদি উভয় পক্ষ নমনীয় মনোভাব প্রদর্শন করে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন পারমাণবিক ইস্যুকে পেছনে রেখে শুধুমাত্র হরমুজ প্রণালী ও যুদ্ধবিরতি নিয়ে আলোচনায় বসতে সম্মত হয় কি না, নাকি এই প্রস্তাব আলোচনার টেবিলে নতুন কোনো অচলাবস্থার সৃষ্টি করে।
তথ্যসূত্র: অ্যাক্সিওস (Axios), আরটি (RT), গালফ নিউজ এবং ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
