দেশের বিভিন্ন জেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের ভয়াবহ তাণ্ডবে গত ৪৮ ঘণ্টায় ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে। আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল, ২০২৬) সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণা, নোয়াখালী ও হবিগঞ্জে বজ্রাঘাতে ৮ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে গতকাল রবিবার (২৬ এপ্রিল) দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একই কারণে আরও ১৪ জন প্রাণ হারান। দুদিনের এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে কৃষিপ্রধান জেলাগুলোতে শোকের মায়া নেমে এসেছে, বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে ধান কাটার মৌসুমে কৃষকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে।
Table of Contents
জেলাভিত্তিক মৃত্যুর পরিসংখ্যান ও বিবরণ
সোমবার দেশের চারটি জেলায় বজ্রপাতের আঘাতে নিহতদের তথ্য এবং কালবৈশাখী ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. সুনামগঞ্জ: হাওরে ধান কাটার সময় ৩ কৃষকের মৃত্যু
সুনামগঞ্জ জেলার পৃথক তিনটি স্থানে বোরো ধান কাটার সময় বজ্রপাতে ৩ কৃষকের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন আরও অন্তত ৩ জন।
সদর উপজেলা: গৌরারং ইউনিয়নের বৈঠাখালী গ্রামের জমির হোসেন (৪২) এবং মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের আব্দুল্লাহপুর গ্রামের জমির উদ্দিন (৪৬) হাওরে কাজ করার সময় সরাসরি বজ্রপাতের শিকার হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান।
জামালগঞ্জ উপজেলা: উপজেলার নোয়াগাঁও গ্রামের আবু সালেহ (২২) সদর উপজেলার একটি হাওরে ধান কাটতে গিয়ে বজ্রাঘাতে প্রাণ হারান।
আহত: শান্তিগঞ্জ উপজেলায় ধান কাটার সময় আরও ৩ জন কৃষক আহত হয়েছেন, যাদের স্থানীয় স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
২. নেত্রকোণা: ধনু নদ ও হাওরে প্রাণ গেল ৩ জনের
নেত্রকোণার খালিয়াজুরী উপজেলায় পৃথক তিনটি স্থানে বজ্রপাতে এক জেলে ও দুই কৃষকের মৃত্যু হয়েছে।
জেলে: জগন্নাথপুর ইউনিয়নের ধনু নদে মাছ ধরার সময় আব্দুল মোতালিব (৫৫) নামে এক জেলের মৃত্যু হয়।
কৃষক: সাতগাঁও গ্রামে বাড়ির সামনের হাওরে ধান শুকাতে গিয়ে মোনায়েম খাঁ পালান এবং কৃষ্ণপুরের ছায়ার হাওরে ধান কাটার সময় শ্রমিক মো. শুভ মন্ডল মারা যান। শুভ মন্ডলের বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলায় বলে নিশ্চিত করেছে পুলিশ।
৩. নোয়াখালী: মায়ের চোখের সামনেই ছেলের মৃত্যু
নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে। চরঈশ্বর ইউনিয়নের পূর্ব গামছাখালী গ্রামে বাদাম ক্ষেত থেকে কাজ করে ফেরার সময় শায়েলা আক্তারের চোখের সামনেই বজ্রাঘাতে মারা যান তার ছেলে মো. আরাফাত হোসেন (২০)। আরাফাত স্থানীয় বাজারের একজন কসমেটিকস ব্যবসায়ী ছিলেন। হাতিয়া থানার ওসি কবির হোসেন ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন।
৪. হবিগঞ্জ: বজ্রপাত ও ঝড়ের দুর্ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু
হবিগঞ্জের বানিয়াচং, নবীগঞ্জ ও চুনারুঘাট উপজেলায় বজ্রপাত এবং ঝড়জনিত দুর্ঘটনায় ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে।
নবীগঞ্জ: নোয়াগাঁও গ্রামের মকসুদ আলী (৫০) হাওর থেকে গরু আনতে গিয়ে বজ্রপাতে নিহত হন।
চুনারুঘাট: সিএনজি অটোরিকশা চালক সায়েদ আলী (৫০) ঝড়ো হাওয়ায় গাড়ি উল্টে নিচে চাপা পড়ে মারা যান।
বানিয়াচং: ঝড়ের সময় গাছের ডাল পড়ে বা দুর্ঘটনায় আব্দুস সালাম (৬৫) নামে এক ব্যক্তি প্রাণ হারান।
রবিবারের ক্ষয়ক্ষতির সংক্ষিপ্ত চিত্র
গত রবিবার (২৬ এপ্রিল) দেশের সাতটি জেলায় কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতে ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। জেলাভিত্তিক চিত্র নিম্নরূপ:
গাইবান্ধা: ৫ জন (সর্বাধিক মৃত্যু)
ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর: প্রতি জেলায় ২ জন করে (মোট ৬ জন)
পঞ্চগড়, বগুড়া ও নাটোর: প্রতি জেলায় ১ জন করে (মোট ৩ জন)
প্রশাসনিক পদক্ষেপ ও সতর্কতা
হবিগঞ্জ ও নেত্রকোণা জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়েছে, বজ্রপাতে নিহত দরিদ্র পরিবারগুলোকে সরকারি তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। ইতিমধ্যে মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করে সহায়তার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আবহাওয়াবিদদের মতে, কালবৈশাখী মৌসুমে বিশেষ করে হাওরাঞ্চলে খোলা জায়গায় অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। মেঘের ডাক বা বিদ্যুৎ চমকানোর সময় খোলা মাঠ, জলাশয় বা গাছের নিচ থেকে সরে এসে দ্রুত পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দেশের কৃষি ও মৎস্য খাতে কর্মরত শ্রমিকদের সুরক্ষায় সচেতনতা বৃদ্ধিতে স্থানীয় প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
একনজরে দুদিনের প্রাণহানি (২৬-২৭ এপ্রিল):
| জেলা | সোমবার (২৭ এপ্রিল) | রবিবার (২৬ এপ্রিল) | মোট |
| সুনামগঞ্জ | ৩ | ০ | ৩ |
| নেত্রকোণা | ৩ | ০ | ৩ |
| নোয়াখালী | ১ | ০ | ১ |
| হবিগঞ্জ | ১ (বজ্রপাতে) + ২ (ঝড়ে) | ০ | ৩ |
| গাইবান্ধা | ০ | ৫ | ৫ |
| অন্যান্য (ঠাকুরগাঁও, সিরাজগঞ্জ, জামালপুর, পঞ্চগড়, বগুড়া, নাটোর) | ০ | ৯ | ৯ |
| সর্বমোট | ১০ | ১২ | ২২ |
