কমলনগরে শেখ হাসিনাকে ফেরাতে মেঘনা নদীর তীরে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শপথ

লক্ষ্মীপুর জেলার কমলনগর উপজেলায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের শতাধিক নেতাকর্মীর গোপন শপথ গ্রহণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে। মেঘনা নদীর তীরবর্তী নির্জন এলাকায় রাতের অন্ধকারে আয়োজিত এই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে নতুন করে উত্তেজনা ও কৌতূহল দেখা দিয়েছে। গত শুক্রবার (২৪ এপ্রিল, ২০২৬) অনুষ্ঠিত এই কর্মসূচির ভিডিওটি তিন দিন পর সোমবার (২৭ এপ্রিল) প্রকাশ্যে আসার পর তা দ্রুত ভাইরাল হয়ে পড়ে।


গোপনীয়তা ও অনুষ্ঠানের পটভূমি

স্থানীয় ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, গত শুক্রবার রাত আনুমানিক সাড়ে ৮টার দিকে কমলনগর উপজেলার চরকালকিনি ইউনিয়নের মতিরহাট সংলগ্ন মেঘনা নদীর তীরে এই গোপন শপথ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। জুলাই পরবর্তী রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে জনসমক্ষে বড় কোনো কর্মসূচি পালন করতে না পারায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মীরা এই নির্জন স্থানটিকে বেছে নেন।

এই কর্মসূচিতে প্রধান সমন্বয়ক ও নেতৃত্বদানকারী হিসেবে স্থানীয় যুবলীগ নেতা জহিরুল ইসলাম রিয়াদ ভাণ্ডারীর নাম উঠে এসেছে। মূলত তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের চাঙ্গা করা এবং দলীয় সভানেত্রীকে দেশে ফিরিয়ে আনার আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিবদ্ধ করতেই এই আয়োজন করা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।


শপথের বিষয়বস্তু ও ভিডিও চিত্র

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটিতে দেখা যায়, রাতের অন্ধকারে মেঘনা নদীর পাড়ে শতাধিক নেতাকর্মী সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের শপথ বাক্য পাঠ করতে দেখা যায়। শপথের মূল অংশে অংশগ্রহণকারীরা অঙ্গীকার করেন যে:

  • তাঁরা বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও যুবলীগের আদর্শ বুকে ধারণ করে মানুষের সেবায় নিয়োজিত থাকবেন।

  • বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে পুনরায় দেশে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে যেকোনো ধরণের আন্দোলন ও সংগ্রাম অব্যাহত রাখবেন।

শপথ শেষে অংশগ্রহণকারীদের ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ সহ বিভিন্ন দলীয় স্লোগান দিতে দেখা যায়। ভিডিওটি তিন দিন পর সোমবার বিকেলে ফেসবুকে প্রকাশ হওয়ার পর থেকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে চাঞ্চল্য দেখা দিলেও সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে।


স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “ভিডিওটি আমি দেখেছি। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে এ ধরণের গোপন কার্যক্রম জনমনে উদ্বেগের সৃষ্টি করতে পারে। বিষয়টি এখন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তাধীন থাকা উচিত এবং তাঁরাই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।”

অন্যদিকে, গোপন স্থানে এ ধরণের শপথ অনুষ্ঠানের বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অবস্থান জানতে কমলনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ফরিদুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে কয়েকবার ফোন করা সত্ত্বেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো মন্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি। ফলে এ ঘটনায় কোনো আইনি ব্যবস্থা বা তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।


রাজনৈতিক গুরুত্ব ও বর্তমান পরিস্থিতি

২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর থেকেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের অধিকাংশ নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন। কমলনগর উপজেলার মেঘনা পাড়ের এই গোপন সমাবেশ প্রমাণ করে যে, স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনটি পুনরায় সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরণের গোপন শপথ গ্রহণ মূলত কেন্দ্রীয় নির্দেশনায় তৃণমূলকে সক্রিয় করার একটি কৌশল হতে পারে।

একনজরে কর্মসূচির বিবরণ:

বিবরণতথ্য
আয়োজকআওয়ামী লীগ ও যুবলীগ, কমলনগর।
নেতৃত্বজহিরুল ইসলাম রিয়াদ ভাণ্ডারী।
স্থানমেঘনা নদীর তীর, মতিরহাট, কমলনগর।
তারিখ ও সময়২৪ এপ্রিল ২০২৬, রাত ৮:৩০ মিনিট।
অংশগ্রহণকারীশতাধিক নেতাকর্মী।
মূল দাবিশেখ হাসিনাকে দেশে ফিরিয়ে আনা।

বর্তমানে কমলনগরের মতিরহাট ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। ভিডিওতে অংশগ্রহণকারী অন্যান্য ব্যক্তিদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চালাচ্ছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো। তবে প্রকাশ্য কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির বদলে নদীর তীরে এমন আয়োজন স্থানীয় রাজনীতির নতুন মেরুকরণকেই নির্দেশ করছে।


তথ্যসূত্র: স্থানীয় প্রতিনিধি ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ফেসবুক)।