ইতিহাসের অমোঘ নিয়ম হলো—কোনো উগ্র ভাবাদর্শ বা ধর্মীয় ফ্যাসিজম একদিনে রাজপথে বন্দুক বা ফতোয়া নিয়ে হাজির হয় না। তার আগে সমাজে বছরের পর বছর ধরে চলে এক নীরব বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি। সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরা দেখিয়েছেন, কীভাবে নিৎসের ধারণাসমূহকে ব্যবহার করে জার্মানিতে নাৎসিবাদ তৈরি হয়েছিল, কিংবা কীভাবে সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদকে অস্ত্র বানিয়ে আধুনিক উগ্র ডানপন্থা ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আহমদ সফার সাহিত্য ও চিন্তাশৈলী ঠিক এই কাজটুকুই সম্পন্ন করেছে। সফা নিজে নিজেকে “বিদ্রোহী”, “একাকী পথিক” বা “মুক্তচিন্তক” বলে দাবি করলেও, তাঁর লিখিত টেক্সটগুলোর ভেতরে এমন এক বিপজ্জনক সংক্রামক ভাইরাস সুপ্ত ছিল, যা গত চার দশকে এদেশের প্রগতিশীল ও সেক্যুলার সমাজব্যবস্থাকে ভেতর থেকে কুড়ে কুড়ে খেয়েছে। ইতিহাস বিকৃতি থেকে শুরু করে সেক্যুলার বুদ্ধিজীবী নিধন—এই পাঁচটি সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ধাপের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে ‘ছফীয় পাইপলাইন’ (Chofamon Pipeline), যা সরাসরি আজকের বাংলাদেশে উগ্র ডানপন্থী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের বুদ্ধিবৃত্তিক খামার (Intellectual Incubator) হিসেবে কাজ করছে।
১. চরমপন্থী রাজনীতির ‘ছফীয় পাইপলাইন’: পাঁচটি ধারাবাহিক ধাপ
আহমদ সফার তাত্ত্বিক সফর পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তিনি বাঙালি মুসলিম সমাজকে এক সুনির্দিষ্ট মনস্তাত্ত্বিক ফানেলের ভেতর দিয়ে চালিত করেছেন। এই ফানেলের শেষ মাথায় অপেক্ষা করছে আধুনিক উগ্র ধর্মীয় রাজনীতি।
[চরমপন্থী রাজনীতিতে উত্তরণের পাঁচ ধাপের ছফীয় পাইপলাইন]
১. ইতিহাস বিকৃতি ──> ২. স্থায়ী ভিকটিমহুড ──> ৩. সাংস্কৃতিক পৃথকীকরণ ──> ৪. সেক্যুলারিজমে সন্দেহ ──> ৫. বুদ্ধিজীবী চরিত্রহনন
(রেনেসাঁ ও প্রমিত (রেসেন্টিমেন্ট ও (যৌথ সাহিত্য বর্জন, (সেক্যুলারিজমকে 'বিদেশি (প্রগতিশীলদের 'ভারতের
ভাষাকে 'হিন্দু চক্রান্ত' 'আমরা শোষিত' 'মুসলিম সাংস্কৃতিক চক্রান্ত' বলে গালি agent' বানিয়ে
আখ্যা দান) মনস্তত্ত্ব তৈরি) ঘর' নির্মাণ) দেওয়া) শূন্যতা সৃষ্টি)
│
▼
[উগ্র ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের
সামাজিক ও রাজনৈতিক রাজত্ব]
ধাপ ১: ইতিহাস বিকৃতি (Distortion of History)
সফা তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের মন’ গ্রন্থে ১৯ শতকের বঙ্গীয় রেনেসাঁ, আধুনিক বাংলা গদ্যের বিকাশ ও অসাম্প্রদায়িক সাহিত্যচর্চাকে মূল্যায়ন করেছেন কেবল একপাক্ষিক সাম্প্রদায়িক চশমায়। বিদ্যাসাগর, রবীন্দ্রনাথ ও প্রমথ চৌধুরীর তৈরি প্রমিত বাংলাকে তিনি চিহ্নিত করলেন “বর্ণহিন্দুদের কৃত্রিম ভাষা” হিসেবে, আর অখণ্ড রেনেসাঁকে আখ্যা দিলেন “মুসলিম-বিরোধী চক্রান্ত”। এর মাধ্যমে তিনি সমাজকে শেখালেন যে—বাংলার আধুনিক সেক্যুলার ইতিহাসের ভিত্তিই নাকি গলদে ভরা!
ধাপ ২: স্থায়ী ভিকটিমহুড ও রেসেন্টিমেন্ট (Permanent Victimhood & Ressentiment)
ঐতিহাসিক শ্রেণিবিশ্লেষণকে পাশে সরিয়ে রেখে সফা বাঙালি মুসলিমের মনে জন্ম দিলেন এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক হীনম্মন্যতা ও স্থায়ী ভিকটিমহুড। সফার বয়ান অনুযায়ী: “বাঙালি মুসলিম সর্বদাই শোষিত, অবহেলিত এবং বর্ণহিন্দুদের ষড়যন্ত্রের শিকার।” এই চতুর শিকার-মনস্তত্ত্ব (Victim Mentality) সাধারণ মানুষের মনে গভীর পরশ্রীকাতরতা ও আক্রোশ (Ressentiment) তৈরি করে, যা যেকোনো উগ্র সাম্প্রদায়িক আন্দোলনের প্রধান মানসিক জ্বালানি।
ধাপ ৩: সাংস্কৃতিক পৃথকীকরণ (Cultural Separatism)
ধাপ ৪: সেক্যুলারিজমে সন্দেহ ও আক্রমণ (Skepticism & Attack on Secularism)
ধাপ ৫: প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী নিধন ও শূন্যতা সৃষ্টি (Assassination of Progressive Intellectuals)
২. সফার ‘ব্যক্তিগত ইচ্ছা’ বনাম ‘দর্শনের বস্তুগত পরিণতি’
ছফাপন্থী অপলাপকারীরা প্রায়শই একটি দুর্বল সাফাই গাওয়ার চেষ্টা করেন: “ছফা তো নিজে জামায়াত করেননি, সফা তো ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, তিনি তো কেবল সত্য কথা বলতে চেয়েছিলেন!”
কিন্তু রাজনৈতিক তত্ত্বের বিচারে একজন লেখকের ‘ব্যক্তিগত ইচ্ছা’ বা ‘ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য’ একেবারেই অচল ও গৌণ বিষয়। মুখ্য বিষয় হলো—তাঁর লেখা টেক্সটের ‘ফাংশনাল ইউটিলিটি’ (Functional Utility) বা সামাজিক-রাজনৈতিক কার্যকারিতা।
সফা যা লিখে রেখে গেছেন, তার বস্তুগত পরিণতি বিচার করার জন্য নিচের উপাত্তভিত্তিক ছকটি যথেষ্ট:
ছফীয় তাত্ত্বিক উপাদান (Textual Input) $\rightarrow$ আধুনিক উগ্র রাজনীতির ফসল (Political Output)
ছফীয় পাঠ: “প্রমিত বাংলা ভাষা ও রেনেসাঁ বর্ণহিন্দুদের চক্রান্ত।”$\rightarrow$ আজকের বাস্তবতা: প্রমিত ভাষার বিরুদ্ধে উগ্র হামলা এবং “ইসলামিক/দোভাষী বাংলা” চালুর সুসংগঠিত দাবি। ছফীয় পাঠ: “পহেলা বৈশাখ ও সেক্যুলার উৎসবগুলো বাঙালি মুসলিমের অবচেতনের বিরোধী।”$\rightarrow$ আজকের বাস্তবতা: মঙ্গল শোভাযাত্রা বন্ধের তোড়জোড়, বৈশাখী মেলায় হামলা এবং লোকজ সংস্কৃতিকে “হিন্দুয়ানি” তকমা। ছফীয় পাঠ: “প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীরা সবাই ভারতের দালাল ও ডলারখোর।”$\rightarrow$ আজকের বাস্তবতা: মুক্তচিন্তার লেখক, শিক্ষক ও সুশীল সমাজকে “শাহবাগী”, “ভারতের এজেন্ট” গালি দিয়ে সামাজিক স্তব্ধতা তৈরি করা। ছফীয় পাঠ: “১৯৭১ হলো ১৯৪৭-এর অসমাপ্ত কাজ এবং পাকিস্তান আন্দোলনেরই খাঁটি রূপ।”$\rightarrow$ আজকের বাস্তবতা: মুক্তিযুদ্ধের সেক্যুলার চেতনাকে অস্বীকার করে পুনরায় দ্বিজাতিতাত্ত্বিক ‘বাংলাদেশি-মুসলিম’ পরিচয়ের উগ্র উন্মাদনা।
সফা কী উদ্দেশ্যে লিখেছেন তা নিয়ে জলঘোলা করার সুযোগ নেই; মূল ঐতিহাসিক সত্য হলো—সফার টেক্সটগুলো প্রতিটি পদক্ষেপে এদেশের উগ্র মৌলবাদী ও ডানপন্থী রাজনীতির হাত শক্তিশালী করেছে।
৩. বর্তমান বাংলাদেশে ‘ছফীয় খামার’ (Intellectual Incubator)
আজকের বাংলাদেশে যদি কোনো ওয়াজী মোল্লা, উগ্র ডানপন্থী কলামিস্ট কিংবা ডিজিটাল ভাবাদর্শিক সাইবার ক্যাডারকে জিজ্ঞাসা করা হয়—তারা কেন সেক্যুলারিজমের বিরুদ্ধে, কেন তারা বৈশাখী উৎসবের বিরুদ্ধে, কিংবা কেন তারা দেশের অগ্রগণ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের “ইসলামবিরোধী চক্রান্তকারী” মনে করে?
তারা কুরআন বা হাদিসের কোনো আয়াত উদ্ধৃত করার আগে উদ্ধৃতি দেবে আহমদ সফার ‘বাঙালি मुसलमानের মন’ বা ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ থেকে!
সফা উগ্র ডানপন্থীদের হাতে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক অস্ত্র তুলে দিয়েছেন, যার মাধ্যমে তারা সেক্যুলার রাজনীতিকে আক্রমণ করার সময় কোনো “ধর্মীয় উন্মাদ” হিসেবে নয়, বরং নিজেদের “উপনিবেশবাদ-বিরোধী, নিম্নবর্গীয় (Subaltern) ও প্রাতিষ্ঠানিকতাবোধের বিরুদ্ধে লড়াইরত প্রগতিশীল যোদ্ধা” হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ পায়! মৌলবাদকে প্রগতির ভাষায় সাজিয়ে দেওয়ার এই ছফীয় শিল্পই হলো আধুনিক বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক ট্র্যাজেডি।
সফা ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন:
“বাঙালি মুসলমানের স্বাতন্ত্র্যকে যে রাজনীতি স্বীকার করবে না, সেই রাজনীতি এদেশের মাটিতে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।”
অস্ত্রকে চিহ্নিত করার সময়
আহমদ সফা কোনো নিরাসক্ত মুক্তচিন্তক ছিলেন না; তিনি ছিলেন প্রগতির ছদ্মবেশ পরা এক চরম প্রতিক্রিয়াশীল দর্শনের প্রকৌশলী।
ইতিহাস → ভিকটিমহুড → সাংস্কৃতিক পৃথকীকরণ → সেক্যুলারিজমে সন্দেহ → প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী নিধন—এই পাঁচটি বিষাক্ত ধাপের মাধ্যমে সফা বাঙালি মুসলিম মনস্তত্ত্বকে এমনভাবে বিষাক্ত করে গেছেন, যার সোজা প্রতিক্রিয়া আজ আমরা রাজপথে, সমাজে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পাই। সফার দর্শন কেবল একটি সাহিত্যিক মতামত হয়ে থাকেনি; তা পরিণত হয়েছে একটি কার্যকর “সাম্প্রদায়িক অস্ত্রে”।
বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রকে যদি উগ্র ডানপন্থী ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের কব্জা থেকে মুক্ত করতে হয়, তবে রাজনৈতিক সংগ্রামের পাশাপাশি আহমদ সফার এই ‘বুদ্ধিবৃত্তিক পাইপলাইন’কে গোড়া থেকে কেটে দিতে হবে। প্রগতির মুখোশ পরা এই সাম্প্রদায়িক বিষবৃক্ষকে উপড়ে ফেলা ছাড়া এদেশের সেক্যুলার, সাম্যবাদী ও মানবিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করার আর কোনো দ্বিতীয় পথ খোলা নেই।







