,

ছফামনের ময়নাতদন্ত: প্রগতির মুখোশ, নাকি সাম্প্রদায়িকতার বুদ্ধিবৃত্তিক আধার? । ছফামন পর্ব ২০

ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে অনেক লেখকের ঠাঁই হয় তাঁর স্থূল মতাদর্শের কারণে, আবার অনেক লেখক দীর্ঘকাল ধরে সমাজকে বিভ্রান্ত করেন তাঁর চটকদার ভাবমূর্তি ও প্রগতির ছদ্মবেশের আড়ালে। আহমদ সফা নিঃসন্দেহে দ্বিতীয় দলের সবচেয়ে চতুর ও ধ্বংসাত্মক প্রতিনিধি। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশের জনপরিসরে সফাকে উপস্থাপন করা হয়েছে এক “আপসহীন বিদ্রোহী”, “একাকী সত্যভাষী” এবং “প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে থাকা একমাত্র বৈপ্লবিক কণ্ঠস্বর” হিসেবে। তাঁর বোহেমিয়ান জীবনযাপন, সোজাসাপ্টা কথা বলার ভঙ্গিমা এবং প্রতিষ্ঠানের প্রতি খিস্তিখেউড় করার চটকদার পপুলিজম তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশকে অন্ধ ও মোহগ্রস্ত করে রেখেছিল।

কিন্তু একজন চিন্তকের ঐতিহাসিক দায়িত্ব বিচার করা হয় তাঁর ব্যক্তিগত ফ্যাশন বা জীবনযাপনের খামখেয়ালিপনা দিয়ে নয়; বিচার করা হয় তাঁর রচিত দর্শনের ঐতিহাসিক ও বস্তুগত পরিণতি (Material Consequences) দিয়ে। এই দীর্ঘ ১৯ পর্বের পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যবচ্ছেদ শেষে যখন আমরা আহমদ সফার লিখিত টেক্সট, রাজনৈতিক অবস্থান ও তার সামাজায়নকে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে রাখি, তখন যে স্পষ্ট ও নির্দয় চিত্রটি ভেসে ওঠে তা হলো—সফা কোনো প্রগতির বাতিঘর ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশে প্রগতির প্রচ্ছদ পরা উগ্র মেজোরিটারিয়ান (সংখ্যাগুরুবাদী) ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সবচেয়ে বড় বুদ্ধিবৃত্তিক আধার (Intellectual Incubator)।

১. চূড়ান্ত রায় ও প্রমাণের একত্রীকরণ: ছফীয় চিন্তার ৫টি মৌলিক অপঘাত

আহমদ সফার সমগ্র সাহিত্যিক ও রাজনৈতিক তাত্ত্বিক কাঠামোর ময়নাতদন্ত করলে দেখা যায়, তিনি মোট পাঁচটি সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক বাঁকের মাধ্যমে এদেশের সেক্যুলার ও প্রগতিশীল রাজনীতিতে বিষবৃক্ষ রোপণ করেছেন:

                  [ছফামনের ময়নাতদন্ত: ৫টি রাজনৈতিক ও তাত্ত্বিক অপঘাত]
                                         │
         ┌───────────────────────────────┼───────────────────────────────┐
         ▼                               ▼                               ▼
[১. ধর্মীয় পরিচয় পুনঃস্থাপন]     [২. বঞ্চনাকে সাম্প্রদায়িক আক্রোশে রূপ]    [৩. কৃত্রিম 'মুসলিম সংস্কৃতি']
ঐতিহাসিক শ্রেণির বদলে               শ্রেণি সংগ্রামকে সরিয়ে 'মুসলিম        যৌথ বাঙালি ধারা বর্জন করে
'মুসলিম পরিচয়'কে প্রধান করা        ভিকটিমহুড' ও রেসেন্টিমেন্ট সৃষ্টি        পৃথক ধর্মীয় সাংস্কৃতিক ঘেরাটোপ
         │                               │                               │
         └───────────────────────────────┼───────────────────────────────┘
                                         │
         ┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
         ▼                                                               ▼
[৪. অসাম্প্রদায়িক সেক্যুলারিজম ধ্বংস]                           [৫. প্রগতিশীল বলয় নিধন ও শূন্যতা সৃষ্টি]
ধর্মনিরপেক্ষতাকে 'ইউরোপীয় বিলাস' ও                                প্রগতিশীলদের 'ভারতের দালাল' বানিয়ে
'মুসলিম অনুভূতির শত্রু' সাব্যস্ত করা                               ডানপন্থীদের জন্য রাজত্ব খালি করা

১. ধর্মীয় পরিচয়কে রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিচয়ের কেন্দ্রে পুনঃস্থাপন

বাংলাদেশের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি ছিল ১৯৬৬-র ছয় দফা ও ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ধর্মভিত্তিক ‘দ্বিজাতিতত্ত্ব’কে রাজনৈতিকভাবে কবর দেওয়া। কিন্তু সফা তাঁর ‘বাঙালি मुसलमानের মন’ (১৯৮১) গ্রন্থে শ্রেণিভিত্তিক, ভাষাগত ও রাজনৈতিক সচেতনতার স্থান থেকে বাঙালিকে টেনে নামিয়ে পুনরায় তার “মুসলিম ধর্মীয় সত্তা”কে মূল পরিচয় হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন।

সফা লিখেছেন: “বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের সংকট তখনই ঘটে, যখন সে নিজের মুসলিম অবচেতনকে অস্বীকার করে সেক্যুলার হতে চায়।”
রাজনৈতিক পরিণতি: এটি সরাসরি অসাম্প্রদায়িক নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তি ভেঙে দিয়ে পুনরায় ‘ইসলামী প্রজাতন্ত্রের’ মনস্তাত্ত্বিক ফ্রেম ফিরিয়ে আনে।

২. ঐতিহাসিক বঞ্চনাকে উগ্র সম্প্রদায়ভিত্তিক ক্ষোভে রূপান্তর (Ressentiment)

১৯ শতকের জমিদারি ও ঔপনিবেশিক শোষণের যে বস্তুনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ভিত্তি ছিল, সফা তাকে সামাজিক-শ্রেণিভিত্তিক বিচারে না দেখে একপাক্ষিক সাম্প্রদায়িক রং লাগান। তিনি সাধারণ বাঙালি মুসলিমের মনে জন্ম দেন চরম পরশ্রীকাতরতা ও শিকার-মনস্তত্ত্ব (Victimhood)।

সফা রেনেসাঁ ও প্রমিত ভাষাকে “বর্ণহিন্দুদের চক্রান্ত” আখ্যা দিয়ে লিখেছেন: “কলকাতার এলিটরা বাঙালি মুসলিমের ভাষা ও সংস্কৃতিকে চিরকাল দাস বানিয়ে রাখতে চেয়েছিল।”
রাজনৈতিক পরিণতি: এই ক্ষোভ উগ্র ডানপন্থীদের শিখিয়েছে কীভাবে ঐতিহাসিক বঞ্চনার রাজনৈতিক দোহাই দিয়ে অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে আক্রোশ ছড়িয়ে দেওয়া যায়।

৩. যৌথ বাঙালি সংস্কৃতির বদলে কৃত্রিম ও পৃথক ‘মুসলিম সাংস্কৃতিক সত্তা’র গোড়াপত্তন

সফা লালন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল ও লোকজ অসাম্প্রদায়িক ঐতিহ্যবাহী সমন্বিত বাঙালি সংস্কৃতিকে “হিন্দু প্রভাবিত” বলে উড়িয়ে দেন। তিনি দাবি করেন বাঙালি মুসলিমের জন্য চাই এক পৃথক “ইসলামিক সাংস্কৃতিক ঘর”।
সফা ‘রাজনীতি ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে লিখেছেন: “এদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষের সংস্কৃতি আর কলকাতার সেক্যুলার সংস্কৃতি এক নয়। বাঙালি মুসলিমকে তার নিজস্ব ধর্মীয় ঐতিহ্যের শিকড়ে ফিরতে হবে।”
রাজনৈতিক পরিণতি: পহেলা বৈশাখ, মঙ্গল শোভাযাত্রা ও সেক্যুলার উৎসবের বিরুদ্ধে আজকের উগ্র ধর্মান্ধদের যে হামলা, তার প্রাথমিক সাংস্কৃতিক বৈধতা জুগিয়েছেন আহমদ সফা।

৪. অসাম্প্রদায়িক ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রচেতনাকে জনগণের মন থেকে উপড়ে ফেলা

১৯৭২ সালের সংবিধানে যে ধর্মনিরপেক্ষতাকে রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতির অন্যতম করা হয়েছিল, সফা তাকে “ইউরোপীয় অপসংস্কৃতি” এবং “সাধারণ মানুষের অনুভূতির বিরোধী চক্রান্ত” হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
সফা লিখেছেন: “সেক্যুলারিজম নাম দিয়ে এদেশের মানুষের ওপর যা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা হলো বিদেশি প্রভুদের সন্তুষ্ট করার এক বিলাসিতা।”
রাজনৈতিক পরিণতি: সংবিধান থেকে সেক্যুলারিজম ছাঁটাই করা সামরিক শাসক (জিয়া-এরশাদ) এবং ইসলামিস্ট দলগুলোর জন্য সফার এই উক্তিগুলো সোনার চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে।

৫. প্রগতিশীল নাগরিক সমাজ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা ধ্বংস করে ডানপন্থীদের সাহায্য করা

সফা তাঁর ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ (১৯৭২) গ্রন্থে স্বাধীন বাংলাদেশের সেক্যুলার, বাম ও প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের ঢালাওভাবে “সুবিধাবাদী”, “পরজীবী” ও “ভারতের এজেন্ট” বলে আক্রমণ করেন।
সফা লিখেছেন: “আমাদের বুদ্ধিজীবীরা দিল্লি ও কলকাতার উচ্ছিষ্ট খেয়ে বেঁচে থাকা সুযোগসন্ধানী পরজীবী।”
রাজনৈতিক পরিণতি: সফা প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীদের নীতিগত মর্যাদা ধূলিসাৎ করে এমন এক বুদ্ধিবৃত্তিক শূন্যতা (Intellectual Vacuum) তৈরি করেন, যার ওপর ভর করে জামায়াতে ইসলামী, শিবির ও আধুনিক কট্টর ইসলামিস্টরা রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছে।

২. প্রগতির চটকদার ভাবমূর্তি বনাম দর্শনের বস্তুগত ফলাফল

ছফাপন্থী ভক্তকুল প্রায়শই দাবি করেন: “সফা তো স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে লিখেছেন, সফা তো একাকী জীবন কাটিয়েছেন, তাঁকে সাম্প্রদায়িক বলা অন্যায়।”

কিন্তু ইতিহাস প্রমাণ করে, রাজনীতিতে কারও ব্যক্তিজীবন দিয়ে তাঁর দর্শনের বিচার হয় না। নিচে ছফীয় ‘প্রগতির চটকদার রূপ’ এবং সমাজে তার ‘বস্তুগত পরিণতি’র একটি নিরপেক্ষ তুলনামূলক সারণি তুলে ধরা হলো:

ছফীয় চটকদার ভাবমূর্তি (The Surface Appearance)সমাজে ছফীয় দর্শনের আসল বস্তুগত পরিণতি (The Real Consequence)
১. প্রতিষ্ঠানের বিরোধী স্বাধীন চিন্তক: সফা কোনো দলের গোলাম হননি, সবার সমালোচনা করেছেন।১. সেক্যুলার প্রতিষ্ঠান ধ্বংস: রাষ্ট্রীয় সেক্যুলার কাঠামোর গ্রহণযোগ্যতা ধ্বংস করে মৌলবাদী রাজনীতির ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছেন।
২. প্রজা-কৃষকের দরদী বন্ধু: সাধারণ মানুষের ভাষা ও অনুভূতির কথা বলেছেন।২. মেজোরিটারিয়ান ফ্যাসিবাদের তোষণ: ‘জনগণের অনুভূতির’ দোহাই দিয়ে সংখ্যাগুরু মুসলিমদের উগ্রতাকে সামাজিক রূপ দিয়েছেন।
৩. অসামপ্রদায়িকতার ছদ্ম-সমালোচক: তিনি নাকি সেক্যুলারদের “ভণ্ডামি” ধরিয়ে দিতে চেয়েছেন।৩. সেক্যুলারিজম-বিদ্বেষ তৈরি: তরুণ প্রজন্মের মনে ‘সেক্যুলারিজম’ শব্দটিকে গালিতে পরিণত করেছেন।
৪. কট্টর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী: তিনি পশ্চিমা ও ভারতীয় সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরোধী ছিলেন।৪. উগ্র ডানপন্থীদের বুদ্ধিবৃত্তিক চালিকাশক্তি: সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার প্রচ্ছদে কট্টর ধর্মীয় সামাজিক পশ্চাৎপদতাকে উৎসাহিত করেছেন।

৩. সমাপনী সিদ্ধান্ত: অসাম্প্রদায়িক ভবিষ্যৎ ও ‘ছফামন’ বর্জনের ঐতিহাসিক দায়

আহমদ সফার বুদ্ধিবৃত্তিক ভূমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে আজ আর কোনো অস্পষ্টতা রাখা চলে না। সফা প্রগতির কোনো বাতিঘর ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক বুদ্ধিবৃত্তিক ট্রোজান হর্স (Trojan Horse)। তিনি প্রগতির পরিভাষা, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতার বুলি এবং নিম্নবর্গীয় পপুলিজমের পোশাক পরে এদেশের সেক্যুলার, গণতান্ত্রিক ও বৈজ্ঞানিক রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিটি স্তম্ভে কুঠারঘাত করেছেন।

আজকের বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে যদি আমরা একটি অসাম্প্রদায়িক, বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক সাম্যবাদী সমাজ গড়ে তুলতে চাই, তবে আমাদের প্রথম ও প্রধান কাজ হবে এই ‘ছফামন’ (Sofa-mindset)-কে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা।

  • ভ্রান্তির অবসান: ছফাকে “প্রগতিশীল চিন্তক” মনে করার ঐতিহাসিক ভুল বন্ধ করতে হবে।
  • ছদ্ম-বিপ্লবী মুখোশ উন্মোচন: ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ বা ‘বাঙালি मुसलमानের মন’-এর মতো টেক্সটগুলো কীভাবে উগ্র মৌলবাদ ও ডানপন্থী রাজনীতির জ্বালানি জোগাচ্ছে, তা প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মাধ্যমে উন্মোচিত করতে হবে।
  • সেক্যুলার সংহতি পুনর্গঠন: ধর্মনিরপেক্ষতা কোনো “বিদেশি আমদানি” নয়, বরং ১৯৭১-এর রক্তস্নাত মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত সকল নাগরিকের সমান অধিকারের গ্যারান্টি—এই নীতিগত সত্যকে পুন প্রতিষ্ঠায় প্রগতিশীল শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

আহমদ সফার চিন্তার বিষাক্ত উপাদানগুলোকে আড়াল করে তাঁকে মহিমান্বিত রাখা মানে প্রকারান্তরে উগ্র ডানপন্থা ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের হাতকেই শক্তিশালী করা। ইতিহাস আমাদের স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে: একটি সেক্যুলার ও মানবিক বাংলাদেশের পুনর্জন্ম ঘটাতে হলে ‘ছফামনের’ এই প্রতিক্রিয়াশীল ঐতিহ্যকে বুদ্ধিবৃত্তিক আদালত থেকে খারিজ করতেই হবে।

Tags :

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক ও প্রকাশক : এ বি এম জাকিরুল হক টিটন ।

জিলাইভ২৪ বিশ্বব্যাপী বাংলাভাষীদের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য অনলাইন নিউজ পোর্টাল; যা রাজনীতি, খেলাধুলা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক সংবাদের সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করে।

© ২০২৬ GLive24। সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত।