অপরাধী দমনে অভিযানে নেমে রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিংবা ক্ষমতাসীন দলের বাঁধার মুখে পড়ার ঘটনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এমন অভিযানের পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বদলি বা প্রত্যাহারের ঘটনা জনমনে আবারও এক পুরনো প্রশ্নকে নতুন করে জাগিয়ে তুলেছে—আইনসম্মত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে যদি কোনো পুলিশ কর্মকর্তাকে পদ হারানোর শঙ্কায় থাকতে হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে কে?
চট্টগ্রামে চট্টগ্রাম মহানগর স্বেচ্ছাসেবক দলের এক বহিষ্কৃত নেতাকে গ্রেফতারের অভিযানের ঠিক পরদিনই সংশ্লিষ্ট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) বদলি করার একটি ঘটনা এ নিয়ে তুমুল বিতর্কের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ৬ অক্টোবর রাতে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নগর ভবন এলাকায় মো. ওয়াকিল হোসেন ওরফে বগা নামের এক তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বহিষ্কৃত নেতাকে গ্রেফতার করতে অভিযানে যায় খুলশী থানা পুলিশ। বগার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি ও হামলাসহ একাধিক মামলা রয়েছে বলে জানা গেছে। তবে ওই রাতের অভিযানে পুলিশ সদস্যদের ওপর বগার অনুসারীরা হামলা চালায় বলেও অভিযোগ ওঠে।
অভিযান কেন্দ্র করে পরবর্তীতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে পুলিশের চরম বাগবিতণ্ডা তৈরি হয়। পরদিন ৭ অক্টোবর দুপুরে এক প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে খুলশী থানার ওসি মো. আবদুর রহিমের পদায়ন ও ভূমিকা নিয়ে সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করেন মেয়র। ওসির বিরুদ্ধে অনিয়ম ও একপেশে আচরণের অভিযোগ তোলার পাশাপাশি তিনি অতীতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ওসির দায়িত্ব সামলেছেন বলে উল্লেখ করেন। তবে বগাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য কিংবা আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগ তিনি পুরোপুরি অস্বীকার করেন।
মেয়রের সেই ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ও বক্তব্যের ঠিক কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই খুলশী থানার ওসি মো. আবদুর রহিমকে এক আদেশে নগর পুলিশের বিশেষ শাখায় (সিটিএসবি) বদলি করা হয়। চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার স্বাক্ষরিত ওই আদেশে বিষয়টিকে ‘জনস্বার্থে’ নেওয়া সিদ্ধান্ত হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, সময় ও পটভূমির কারণে এই বদলি নিয়ে সুশীল সমাজ ও আমজনতার মনে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহল অবশ্য এই বিতর্ককে খুব একটা আমল দিতে নারাজ। বিষয়টি নিয়ে পুলিশের অতিরিক্ত আইজি সায়েদুর রহমান স্পষ্ট করে জানান, সরকারি চাকরিতে বদলি একটি স্বাভাবিক ও নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, এটি কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়। দীর্ঘদিন এক জায়গায় দায়িত্বে থাকার পর কিংবা বৃহত্তর স্বার্থেই কর্মকর্তাদের রদবদল করা হয়ে থাকে।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, আইনসম্মত কাজে কেউ কোনো বাধা সৃষ্টি করলে সে বিষয়ে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার যেমন সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে, তেমনি কোনো কর্মকর্তা বদলি হলেও তা বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের স্বাভাবিক অংশ। তবে এলাকায় ভালো কাজ করা কর্মকর্তা হুট করে চলে গেলে স্থানীয় সাধারণ জনগণের মনে আবেগময় কিংবা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলেও স্বীকার করেন তিনি।
অন্যদিকে এই ঘটনাটিকে ভিন্ন নজরে দেখছেন অপরাধবিজ্ঞানীরা। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ উমর ফারুক বিষয়টির গভীরতা তুলে ধরে বলেন, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও প্রভাব যদি বহাল থাকে, তবে স্বাধীন ও জবাবদিহিমূলক পুলিশিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা অসম্ভব। অনেক পেশাদার কর্মকর্তা সাহসের সঙ্গে কাজ করতে চাইলেও বদলি কিংবা পদায়নবঞ্চনার ভয়ে পিছু হটতে বাধ্য হন। এর ফলে শুধু একজন কর্মকর্তার মনোবল ভেঙে পড়ে না, বরং পুরো বাহিনীর শৃঙ্খলা ও জনআস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠনের তাগিদ দেওয়া হলেও তা বাস্তবে আলোর মুখ দেখেনি। পুলিশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী এবং তারা রাষ্ট্রের স্বার্থে কাজ করবে, কোনো রাজনৈতিক শিবিরের স্বার্থরক্ষায় নয়। পুলিশকে যদি দলীয় উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা বন্ধ না হয়, তবে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়ন অসম্ভব।
এমন রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়া হলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান জানান, কোনো নির্দিষ্ট ঘটনার গভীরে তাঁর জানা নেই। তবে সরকার কোনো অপরাধীকে দলীয় পরিচয়ে ছাড় দিচ্ছে না। আইন নিজের গতিতেই চলছে এবং অপরাধীদের ক্ষেত্রে শূন্য সহনশীলতা (জিরো টলারেন্স) নীতি বজায় রাখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, বদলি যদি কেবলই প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও হয়ে থাকে, কোনো স্পর্শকাতর কিংবা আলোচিত অভিযানের পরপরই দ্রুত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন সাধারণ মানুষকে অন্য বার্তা দেয়। অপরাধ দমনে পুলিশের ক্ষমতা ও প্রশাসনিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা না গেলে শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপরই তার দীর্ঘমেয়াদি আঁচ গিয়ে পড়বে।









