আহমদ সফার বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়নে সবচেয়ে বড় সামাজিক প্রতারণা ও পদ্ধতিগত ভণ্ডামি উন্মোচিত হয় মৌলবাদ ও সেক্যুলার সুশীল সমাজের প্রতি তাঁর চরম দ্বৈত মানদণ্ডে (Double Standard)। প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবী, মানবাধিকার কর্মী বা সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলোর সামান্য ভুলভ্রান্তি, পদ-পদবি গ্রহণ কিংবা রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতা দেখা দিলেই সফা আবির্ভূত হতেন চরম নির্দয়, অ্যাসিড-ঝরানো ও চরিত্রহননকারী এক বিচারক হিসেবে। তিনি তাদের গায়ে সাঁটিয়ে দিতেন “উচ্ছিষ্টভোগী”, “জাতীয় শত্রু” কিংবা “ভারতের এজেন্ট”-এর তকমা।
১. সেক্যুলারদের প্রতি বিষোদ্গার বনাম মৌলবাদে সোহাগ: ছফীয় দ্বৈত মানদণ্ড
আহমদ সফা তাঁর ‘বাঙালি মুসলমানের মন’, ‘বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস’ এবং রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধগুলোতে যে দ্বৈত অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, তা নিচে পাশাপাশি রাখলেই তাঁর তাত্ত্বিক অসাধুতা প্রকাশ পেয়ে যায়:
- সেক্যুলার সুশীল সমাজের ক্ষেত্রে: কোনো প্রগতিশীল লেখক বা শিক্ষক যদি রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পান, এনজিওর সাথে যুক্ত থাকেন কিংবা সেক্যুলারিজমের কথা বলেন, সফা তাঁকে সঙ্গে সঙ্গে “বিলাসী”, “ইমানহীন”, “ডলারখোর” এবং “কলকাতার সাগরেদ” বলে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করতেন।
- উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের ক্ষেত্রে: কোনো ধর্মান্ধ গোষ্ঠী যখন অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির ওপর আঘাত করত, নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়ার বিরোধিতা করত কিংবা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর চড়াও হতো, সফা সেই উগ্রতাকে “মুসলিম কৃষকের প্রান্তিকতার স্বাভাবিক প্রতিচ্ছবি” বা “সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া” বলে সাফাই গাইতেন!
“এদেশের সাধারণ মানুষ যখন ধর্মের আহ্বানে সাড়া দেয় বা ধর্মীয় গোঁড়ামির আশ্রয় নেয়, তখন তাকে কেবল প্রতিক্রিয়াশীলতা বলে উড়িয়ে দিলে চলবে না। বুঝতে হবে, যে সেক্যুলার সংস্কৃতি তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে, সেখানে তারা নিজেদের আত্মিক ও সামাজিক ঠাঁই পায়নি। সুতরাং মৌলবাদের এই উত্থান আসলে এলিটদের তৈরি সেক্যুলার চক্রান্তের বিরুদ্ধে অবহেলিত জনমানুষের এক স্বাভাবিক অবচেতন প্রতিরোধ।”
এই যুক্তির ভেতরের ভয়াবহ বিপজ্জনক কৌশলটি খেয়াল করুন:
১. অপরাধের দায় ভুক্তভোগীর ওপর চাপানো: ধর্মান্ধরা যে অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র ও নাগরিক অধিকারের ওপর হামলা চালাচ্ছে—তার জন্য মৌলবাদীদের কোনো দোষ নেই; দায় নাকি সেক্যুলারিজমের!
২. উগ্রবাদকে ‘গণমানুষের ক্ষোভ’ বানিয়ে ধোয়া তুলসীপাতা করা: সফা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতাকে সমাজতাত্ত্বিক “বৈষম্যের ফল” বলে এমন এক প্রচ্ছদ পরালেন, যা ধর্মান্ধদের নৈতিক ও সামাজিক দায়মুক্তি এনে দেয়।
২. প্রগতির ভাষায় মৌলবাদের চতুর ‘ইন্টেলেকচুয়াল লাউন্ডারিং’
বিশ্বজুড়ে উগ্র ডানপন্থীরা সর্বদা এমন একজন বুদ্ধিজীবীর সন্ধান করে, যিনি প্রগতির পরিভাষা ব্যবহার করে তাদের মধ্যযুগীয় উগ্রবাদকে আধুনিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলবেন। বাংলাদেশে আহমদ সফা ঠিক এই কাজটিই সম্পন্ন করে গেছেন।
সফা পোস্ট-কলোনিয়াল (উত্তর-ঔপনিবেশিক), সাবঅল্টার্ন (নিম্নবর্গীয়) এবং সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী শব্দমালা ব্যবহার করে উগ্র ধর্মীয় মৌলবাদের ‘বুদ্ধিবৃত্তিক ধোলাই’ (Intellectual Laundering) করেছেন।
[ছফীয় দ্বৈত নীতি ও ভাবাদর্শিক লাউন্ডারিং মডেল]
│
┌───────────────────────────────┴───────────────────────────────┐
▼ ▼
[সেক্যুলার ও নাগরিক সমাজের বিচারে ছফা] [উগ্র মৌলবাদ ও ধর্মান্ধতার বিচারে ছফা]
• সামান্য ভুলে ঢালাও চরিত্রহনন ও কাদা ছোঁড়াছুড়ি • সহিংসতার পেছনের সামাজিক ক্ষোভের তত্ত্বায়নে সহানুভূতি
• আখ্যা: 'উচ্ছিষ্টভোগী', 'দালানিলানি', 'ভারতের এজেন্ট' • আখ্যা: 'মুসলিম অবচেতনের স্বাভাবিক প্রকাশ', 'প্রান্তিক প্রতিরোধ'
• লক্ষ্য: সেক্যুলার প্রাতিষ্ঠানিকতার নৈতিক পতন ঘটানো • লক্ষ্য: উগ্র ধর্মীয় মানসিকতাকে 'জনপ্রিয় সমাজচেতনা' বলে বৈধতা দেওয়া
*ফলাফল:* সেক্যুলার বলয়ের ভয়াবহ অবক্ষয় *ফলাফল:* উগ্র ডানপন্থা ও ফ্যাসিবাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা
“আমাদের দেশের সুশীল সমাজ যখন মৌলবাদের জুজু দেখায়, তখন বুঝতে হবে তারা আসলে নিজেদের কায়েমী স্বার্থ রক্ষা করতে চায়। মৌলবাদ কোনো উড়ে এসে জুড়ে বসা জিনিস নয়, এটি এদেশের মাটির ক্ষোভ থেকে জন্ম নেওয়া এক বাস্তবতা।”
এখানে সফা মৌলবাদকে একটি প্রাতিষ্ঠানিক রাজনৈতিক ফ্যাসিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করতে অস্বীকার করলেন। তিনি একে “মাটির ক্ষোভ” বলে এমন এক রূপ দিলেন, যা সাধারণ মানুষকে শেখায় যে মৌলবাদের বিরুদ্ধাচরণ করা মানে নাকি “এদেশের মাটির বিরুদ্ধাচরণ করা”!
৩. নীতিগত ভণ্ডামি: সহিংসতাকে ‘সামাজিক প্রতিক্রিয়া’ হিসেবে জাস্টিফাই করার কুফল
কোনো সমাজের বুদ্ধিজীবী যখন কোনো ফ্যাসিবাদের পেছনে “সামাজিক কারণ” খুঁজে এনে তাকে নৈতিকভাবে জাস্টিফাই করতে শুরু করেন, তখন সেই সমাজে আইন, মানবাধিকার ও সেক্যুলার কাঠামোর বিনাশ ঘটে।
সফার এই দ্বৈত নীতির সরাসরি কুফলগুলো হলো:
১. মৌলবাদীদের সাহস বৃদ্ধি: ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা বুঝে যায় যে, তারা যত তাণ্ডবই চালাক না কেন, সফার মতো প্রগতিশীল ছদ্মবেশধারী বুদ্ধিজীবীরা সেটিকে “সেক্যুলার এলিটদের শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া” বলে রাজনৈতিক সুরক্ষা দেবে।
২. সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তাহীনতা: যখন সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা বা তাদের সংস্কৃতির ওপর আঘাতকে “মুসলিম মানসের ক্ষোভ” বলে ব্যাখ্যা করা হয়, তখন ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় এবং অপরাধীরা সামাজিক বীরের মর্যাদা পায়।
৩. সেক্যুলার রাজনীতির তোষণবাদ: এই ছফীয় দ্বৈত রাজনীতির ফাঁদে পড়ে এদেশের অনেক তথাকথিত প্রগতিশীল ও বামপন্থী দলও মৌলবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট নীতিগত অবস্থান না নিয়ে “এরা তো প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি” বলে ধর্মীয় উগ্রবাদের সামনে নতি স্বীকার করা শুরু করে।
৪. বর্তমান উগ্র ডানপন্থীদের ‘ছফীয় রেসিপি’: আধুনিক উগ্রবাদের ব্লুপ্রিন্ট
আজকের বাংলাদেশে (বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, টকশো ও তরুণ প্রজন্মের একাংশের মধ্যে) উগ্র ডানপন্থী ও রাজনৈতিক ইসলামপন্থীরা যে ভাষার রাজনীতি চর্চা করে, তা সম্পূর্ণভাবে আহমদ সফার তৈরি করা এই রেসিপির ওপর নির্মিত।
- প্রগতির পরিভাষায় মৌলবাদ তোষণ: আজকের ইসলামিস্ট তাত্ত্বিকেরা (যেমন: ফরহাদ মজহার থেকে শুরু করে আধুনিক ডিজিটাল ওয়াজিরা) যখন হিজাব, নারী-বিদ্বেষ, হেফাজতি তাণ্ডব কিংবা ভাস্কর্য ভাঙার সাফাই গায়, তখন তারা কোনো ধর্মীয় ফতোয়া দেয় না; তারা আহমদ সফার বই থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলে—”এগুলো তো আমাদের লোকায়ত প্রজা-কৃষকের এন্ট্রি-এলিট সাংস্কৃতিক সংগ্রাম!”
- সেক্যুলারদের মুখ বন্ধ করার কুঠার: কেউ যদি ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে কথা বলে, তবেই সফার শেখানো সেই পুরনো টেপ চালানো হয়—”তুমি সুশীল, তুমি ডলারখোর, তুমি কলকাতার দালাল, তুমি সাধারণ মানুষের অনুভূতি বোঝো না।”
প্রগতির রূপধারী ভণ্ডামির অবসান ঘটাতে হবে
আহমদ সফা নিজেকে আপসহীন ও নিরপেক্ষ সত্যের প্রবক্তা হিসেবে উপস্থাপন করলেও, ইতিহাস প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন উগ্র মৌলবাদের সবচেয়ে চতুর বুদ্ধিবৃত্তিক ঢাল।
তিনি সেক্যুলার সুশীল সমাজকে ধূলিসাৎ করতে বিন্দুমাত্র দয়া দেখাননি, কিন্তু ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের তীব্র সহিংসতার সামনে দাঁড় করিয়েছেন সমাজতাত্ত্বিক সহানুভূতির সুর। সফার এই নীতিগত ভণ্ডামি এদেশের প্রগতিশীল রাজনীতিকে ভেতরে ভেতরে ফাঁপা করে দিয়েছে এবং উগ্র ডানপন্থীদের হাতে তুলে দিয়েছে সেক্যুলারিজমকে ধ্বংস করার ধারালো ছদ্ম-বিপ্লবী অস্ত্র। বাংলাদেশের সমাজকে যদি উগ্র মৌলবাদ ও ডানপন্থী ফ্যাসিবাদের আগ্রাসন থেকে রক্ষা করতে হয়, তবে আহমদ সফার এই ‘মৌলবাদ-তোষণকারী দ্বৈত নীতি’র মুখোশ জনপরিসরে উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরী।







