বাংলা সাহিত্যের অন্যতম আলোচিত, প্রথাবিরোধী ও বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনের জন্মদিন আজ, ২৫ আগস্ট। ১৯৬২ সালের এই দিনে ময়মনসিংহ শহরে জন্মগ্রহণ করা এই সাহিত্যিক আজ ৬৪ বছরে পদার্পণ করলেন। কবিতা, উপন্যাস, কলাম ও আত্মজীবনীমূলক রচনায় নারীর অধিকার, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং ধর্মীয় গোঁড়ামির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে তিনি বাংলা সাহিত্য ও সমাজচিন্তায় এক নজিরবিহীন আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন।
চিকিৎসক পরিবারে জন্ম নেওয়া তসলিমার বাবা রজব আলী ছিলেন পেশায় চিকিৎসক এবং মা ঈদুল ওয়ারা ছিলেন গৃহিণী। চার ভাই-বোনের মধ্যে তৃতীয় তসলিমার শৈশব ও কৌশোর কাটে ময়মনসিংহে। সেখানে চিকিৎসাবিজ্ঞানে পড়াশোনার পাশাপাশি সমানতালে সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যান তিনি। ময়মনসিংহ রেসিডেনসিয়াল স্কুল থেকে ১৯৭৬ সালে এসএসসি ও ১৯৭৮ সালে আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি পাসের পর তিনি ভর্তি হন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজে। ১৯৮৪ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জন করে তিনি সরকারি গ্রামীণ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতালের স্ত্রীরোগ বিভাগ এবং পরবর্তীতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অ্যানেসথেসিওলজি বিভাগে সফলতার সঙ্গে চিকিৎসাসেবা প্রদান করেন।
চিকিৎসকের সাদা অ্যাপ্রন পরিহিত থাকলেও তসলিমার ভেতরের সত্তাটি ছিল একজন কবি ও সাহিত্যিকের। মাত্র ১৩ বছর বয়সে তাঁর হাতে কবিতার খাতা ওঠে। কলেজজীবনে ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত তিনি ‘সেঁজুতি’ নামের একটি সাহিত্যপত্র সম্পাদনা ও প্রকাশ করেন। ১৯৮৬ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘শিকড়ে বিপুল ক্ষুধা’ প্রকাশিত হলে সাহিত্যঅঙ্গনে নজর কাড়েন তিনি। পরবর্তীতে ‘নির্বাসিত বাহিরে অন্তরে’, ‘আমার কিছু যায় আসে না’, ‘অতলে অন্তরীণ’, ‘বালিকার গোল্লাছুট’ ও ‘বেহুলা একা ভাসিয়েছিল ভেলা’ কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে নারীজীবনের বঞ্চনা, নিঃসঙ্গতা ও ক্ষোভকে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন।
নব্বইয়ের দশকে জাতীয় দৈনিকগুলোতে নারী অধিকার ও ধর্মীয় মৌলবাদের সমালোচনা নিয়ে তাঁর কলাম প্রকাশ হতে থাকলে তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। ১৯৯২ সালে তাঁর ‘নির্বাচিত কলাম’ গ্রন্থের জন্য তিনি ভারতের সম্মানজনক ‘আনন্দ পুরস্কার’ লাভ করেন। তবে ১৯৯৩ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক পটভূমিতে রচিত তাঁর উপন্যাস ‘লজ্জা’ প্রকাশের পর তীব্র ধর্মীয় বিতর্কের ঝড় ওঠে। একাধিক মৌলবাদী গোষ্ঠী তাঁর মাথার দাম ঘোষণা করে ফতোয়া জারি করে। চরম নিরাপত্তা সংকটের মুখে ১৯৯৪ সালে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন এবং এরপর থেকে ইউরোপ ও ভারতে দীর্ঘ নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন।
দেশ ছাড়লেও নিজের ভাষা ও মূল শিকড় থেকে দূরে থেকে তসলিমা তাঁর সাহিত্যচর্চা থামাননি। ‘আমার মেয়েবেলা’, ‘উতাল হাওয়া’, ‘ক’ সহ তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থগুলোতে সমাজ, ধর্ম ও ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্ন তুলে ধরে তিনি বহুবার বাংলাদেশ ও ভারতে নিষেধাজ্ঞা ও বাধার মুখোমুখি হয়েছেন। দীর্ঘ নির্বাসনকে সঙ্গে নিয়ে আজ ৬৪ বছরে পা দিলেন এই নির্ভীক কবি। মুক্তচিন্তার সমর্থকদের অভিবাদনে আজ আবারও উচ্চারিত হচ্ছে—দ্রোহের কলমে জেগে থাকুক তাঁর সাহস, সাহিত্যের অঙ্গন আলোকিত হোক প্রথাবিরোধী সৃষ্টির নতুন আলোয়।









