জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

তালাবদ্ধ ফ্ল্যাটে দুই শিশু, পাশের কক্ষে মায়ের মরদেহ

জামালপুর শহরের শেখের ভিটা এলাকায় একটি ভাড়া বাসার তালাবদ্ধ ফ্ল্যাট থেকে ইসরাত জাহান (৩২) নামের এক নারীর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। একই ফ্ল্যাটের অন্য একটি কক্ষে তালাবদ্ধ অবস্থায় পাওয়া গেছে তাঁর ৭ বছর বয়সী মেয়ে ও ৫ বছর বয়সী ছেলে। রোববার দুপুরের দিকে ছয়তলা ভবনের পঞ্চম তলার ওই ফ্ল্যাটে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা গিয়ে মরদেহ এবং দুই শিশুকে উদ্ধার করেন।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ইসরাত জাহানকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ, হত্যাকাণ্ডের সময় এবং এর পেছনে কারা জড়িত—এসব বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

নিহত ইসরাত জাহান শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার সরকারদী গ্রামের মো. ইব্রাহিমের মেয়ে। তাঁর স্বামী মো. শাওন প্রায় এক বছর আগে মারা যান। এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি জীবনযাপন করছিলেন। ঘটনার আগে প্রায় এক মাস ধরে জামালপুর শহরের শেখের ভিটা এলাকার ওই ভাড়া বাসায় তিনি বসবাস করছিলেন।

স্থানীয় সূত্র ও পুলিশের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, ইসরাতের সঙ্গে মো. কাউসার আহাম্মেদ নামের এক যুবকও ওই বাসায় থাকতেন। বাড়ির মালিকের কাছে কাউসার নিজেকে ইসরাতের স্বামী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন। তিনি ব্যবসা করেন বলেও জানিয়েছিলেন। তবে তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃত ধরন, ওই বাসায় একসঙ্গে থাকার কারণ এবং ঘটনার সঙ্গে কাউসারের সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে পুলিশ এখনো নিশ্চিত হয়নি। ঘটনার পর থেকেই তিনি পলাতক রয়েছেন।

রোববার সকালে অস্বাভাবিক একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসে। ফ্ল্যাটের একটি কক্ষের জানালা দিয়ে দুই শিশু বাইরে থাকা লোকজনের কাছে পানি চাইতে থাকে। শিশুদের কান্না ও আকুতি শুনে স্থানীয় কয়েকজনের সন্দেহ হয়। তাঁরা ফ্ল্যাটের সামনে গিয়ে দেখতে পান, মূল দরজায় বাইরে থেকে তালা ঝুলছে।

পরে বিষয়টি জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ জানানো হয়। খবর পেয়ে পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। দরজার তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে প্রবেশ করার পর একটি কক্ষে দুই শিশুকে আটকা অবস্থায় পাওয়া যায়। তাদের দ্রুত উদ্ধার করে নিরাপদে বের করে আনা হয়। এরপর পাশের একটি কক্ষে বিছানার ওপর ইসরাত জাহানের মরদেহ পড়ে থাকতে দেখা যায়।

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। একই সঙ্গে ফ্ল্যাটের ভেতরের পরিস্থিতি, দরজায় বাইরে থেকে তালা লাগানোর বিষয়, শিশুদের অবস্থান এবং নিহত নারীর মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল—এসব দিক খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

জামালপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নাজমুস সাকিব জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ওই নারীকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং এর সঙ্গে কারা জড়িত, তা তদন্ত করে বের করার চেষ্টা চলছে।

ঘটনার পর নিহতের পরিবারের সদস্যরা থানায় গিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের কাছ থেকেও ইসরাতের সাম্প্রতিক জীবনযাপন, পারিবারিক পরিস্থিতি এবং ওই যুবকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি পলাতক কাউসার আহাম্মেদের অবস্থান শনাক্ত করে তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনার চেষ্টা করছে পুলিশ।

এই ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হয়ে উঠেছে দুই শিশুর অবস্থান। মায়ের মরদেহ পড়ে থাকা ঘরের পাশেই তারা দীর্ঘ সময় তালাবদ্ধ ছিল। বাইরে থেকে সাহায্য না পেলে তাদের পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারত। জানালা দিয়ে পানি চাওয়ার ঘটনাই শেষ পর্যন্ত স্থানীয়দের দৃষ্টি আকর্ষণ করে এবং তাঁদের উদ্যোগে পুলিশকে খবর দেওয়া সম্ভব হয়।

এখন তদন্তকারীদের সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে—ইসরাত জাহানের মৃত্যু ঠিক কখন ঘটেছে, তাঁর মৃত্যুর আগে ফ্ল্যাটে কী ঘটেছিল, দরজায় বাইরে থেকে তালা কে লাগিয়েছিল এবং ঘটনার পর পলাতক ব্যক্তির ভূমিকা কী। এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুলিশ সাক্ষ্য, ঘটনাস্থলের আলামত, ময়নাতদন্তের ফল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করছে। আইনগত প্রক্রিয়ার পাশাপাশি তদন্ত এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর