তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে দেশের নিট পোশাক খাত এখন স্মরণকালের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি। কারখানায় গ্যাসের চাপ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় না থাকায় শিল্প উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে, অনেক জায়গায় কাজ একপ্রকার বন্ধ হয়ে পড়েছে। সংকট সামলাতে না পেরে এরই মধ্যে প্রায় ৩০০টি নিট পোশাক কারখানা পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন মালিকেরা। সময়মতো তৈরি পণ্য জাহাজীকরণ না হওয়ায় বিদেশী ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে রফতানি আদেশ সরিয়ে অন্য দেশে নিয়ে যাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্ভূত সংকট নিরসনে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ৬ দফা দাবি উত্থাপন করেছে বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ)।
শনিবার (২২ আগস্ট) সন্ধ্যায় রাজধানীর বিকেএমইএ ভবনে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে দেশের পোশাক খাতের সার্বিক এই নাজুক পরিস্থিতি তুলে ধরেন সংগঠনের সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি জানান, গত মাসের ২০ তারিখ থেকে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে তীব্র গ্যাস সংকট শুরু হয়। অধিকাংশ কারখানায় গ্যাসের প্রেশার বা চাপ শূন্য পিএসআই-এ নেমে আসে। সরকারের পক্ষ থেকে চলতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে সংকট কাটার আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে কোনো উন্নতি হয়নি। যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে রফতানি খাতে। বর্তমানে নিট পোশাক খাতের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ রফতানি ব্যাহত হয়েছে, যার আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দেড় থেকে দুই মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি।
সংবাদ সম্মেলনে শিল্পমালিকদের চরম দুর্ভোগের কথা উল্লেখ করে মোহাম্মদ হাতেম বলেন, পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন বন্ধ থাকলেও শ্রমিকদের বেতন, ঘর ভাড়া এবং অন্যান্য পরিচালনা ব্যয় অপরিবর্তিত রয়েছে। আয়ের পথ বন্ধ থাকলেও নিয়মিত বিপুল পরিমাণ দায়দেনা পরিশোধ করতে গিয়ে ব্যবসায়ীদের পিঠ এখন দেওয়ালে ঠেকে গেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ভাবমূর্তি চরম সংকটের মুখে পড়ছে। সময়মতো পণ্য না পাওয়ার আশঙ্কায় ক্রেতারা তাদের রফতানি আদেশ অন্য দেশে স্থানান্তরিত করছেন, যা দেশের অর্থনীতির জন্য মারাত্মক দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতি ডেকে আনছে।
শিল্প খাতকে এই মহাবিপর্যয় থেকে বাঁচাতে বিকেএমইএর পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে ৬টি স্পষ্ট দাবি পেশ করা হয়:
বকেয়া বিলে ১২ মাসের কিস্তি সুবিধা: সংকটকালীন জুন ও জুলাই মাসের বকেয়া গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিল একযোগে না নিয়ে আগামী ১২ মাসের সহজ কিস্তিতে পরিশোধের সুনির্দিষ্ট সুবিধা প্রদান করতে হবে।
সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করা: উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কোনো শিল্প কারখানা সাময়িকভাবে গ্যাস বিল পরিশোধে ব্যর্থ হলে তাদের সংযোগ কোনো অবস্থাতেই কেটে দেওয়া যাবে না।
সাপ্তাহিক সরকারি ব্রিফিং: শিল্পক্ষেত্রে গ্যাসের প্রকৃত সরবরাহ ও অবস্থা সম্পর্কে মালিকদের সঠিক তথ্য জানাতে এবং বিভ্রান্তিকর গুজব প্রতিরোধে প্রতি সপ্তাহে সরকারের পক্ষ থেকে দাপ্তরিক ব্রিফিং করতে হবে।
পাবলিক ট্রান্সপোর্টে অগ্রাধিকার: কারখানায় নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে গণপরিবহন বাদে অন্যান্য সকল ব্যক্তিগত গাড়ি ও অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সিএনজি বা গ্যাস সরবরাহ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।
অবৈধ গ্যাস সংযোগ উচ্ছেদ: আবাসিক ও বাণিজ্যিক খাতে চলমান অবৈধ গ্যাস সংযোগগুলো বিচ্ছিন্ন করতে সরকারকে কঠোর ও জিরো টলারেন্স অভিযান পরিচালনা করতে হবে।
ঋণখেলাপি না করার অনুরোধ: গ্যাস সংকটের দরুন যেসব প্রতিষ্ঠান ব্যাংকের নিয়মিত ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ হবে, পরিস্থিতির বিচারে তাদেরকে কোনোভাবেই ঋণখেলাপি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বিকেএমইএ নেতৃবৃন্দ অভিযোগ করেন, রাষ্ট্রীয় সংস্থা তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি নিজেরাই স্বীকার করেছে যে সিস্টেমে প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ লস হচ্ছে। মূলত অবৈধ সংযোগ এবং চুরির কারণেই জাতীয় এই সম্পদ অপচয় হচ্ছে। কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে অবৈধ বিতরণ বন্ধ করা গেলে শিল্প কারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাসের ব্যবস্থা করা সহজ হতো। সংবাদ সম্মেলনে বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি কাজী মনিরুজ্জামান, বিকেএমইএর নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, সহসভাপতি মোর্শেদ সারওয়ার সোহেল এবং সহসভাপতি আশিকুর রহমানসহ সংগঠনের অন্য জ্যেষ্ঠ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।









