কোনো উন্নয়নমূলক প্রকল্প নেই, নেই সড়ক প্রশস্তকরণের সরকারি কোনো অনুমোদনও। তবুও সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের প্রায় ১৯ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে সাড়ে চার হাজার পথতরু কাটার তোড়জোড় শুরু করেছে বন বিভাগ। অথচ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই সড়কটি প্রশস্ত করার কোনো পরিকল্পনা বর্তমানে তাদের নেই। বন বিভাগ ঠিক কী কারণে এই গাছগুলো কাটছে, সে বিষয়ে সওজ কিছুই জানে না; কেবল দরপত্রের একটি অনুলিপি তাদের দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।
অপ্রয়োজনে সড়কের দুধারের এই পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ নিধনের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশবাদী সংগঠনের মধ্যে। শনিবার সুনামগঞ্জ জেলা হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের ব্যানারে সড়কের ইচ্ছারচর এলাকায় একটি বিক্ষোভ ও মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গাছ কাটা সম্পূর্ণ বন্ধের আলটিমেটাম দেন পরিবেশকর্মীরা। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে গাছ কাটা বন্ধ না হলে জেলা বন অফিস ঘেরাওয়ের মতো কঠোর কর্মসূচি পালনের স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
মাঠপর্যায় থেকে অভিযোগ উঠেছে, দরপত্রে আকাশমণি বা রেইনট্রির মতো নির্দিষ্ট প্রজাতির গাছ কাটার কথা বলা হলেও প্রকৃতপক্ষে কাটা হচ্ছে বহু বছরের পুরনো দেশীয় ফলদ ও ছায়াবৃক্ষ। ইচ্ছারচর গ্রামের বাসিন্দা মানিক মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, বাড়ির সামনে তিনি নিজে যে জামগাছটি লাগিয়েছিলেন, এলাকার সাধারণ শিক্ষার্থী ও পথচারীরা যার ছায়ায় জিরোতেন, সেটিও কেটে ফেলা হয়েছে। স্থানীয়রা সম্মিলিতভাবে বাধা দিলেও তা অগ্রাহ্য করে ক্ষমতার জোরে গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে বলে জানান আরেক বাসিন্দা আবুল হোসেন।
হাওর ও নদীরক্ষা আন্দোলনের নেতাদের তথ্যমতে, মাত্র ৮৪ লাখ ৮০ হাজার টাকায় মোট ৪ হাজার ৪৬৮টি গাছ বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। অথচ বর্তমান বাজারে এসব গাছের কাঠের প্রকৃত মূল্য কয়েক কোটি টাকা। একদিকে এত কম দামে গাছ বিক্রির ফলে সরকার যেমন বিপুল রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে হুমকিতে পড়ছে।
আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়টি মনে করিয়ে দিয়ে সংগঠনটির নেতৃবৃন্দ জানান, ২০২৫ সালে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ (এইচআরপিবি)-এর এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক বনায়নের গাছ না কেটে সরকারি ফান্ড থেকে নির্বাচিত উপকারভোগীদের লভ্যাংশের সমপরিমাণ অর্থ প্রদান করতে হবে। স্থানীয় বন কর্মকর্তা রিয়াজ উদ্দিন অবশ্য দাবি করেছেন জেলা কমিটির অনুমোদন পেয়েই এই দরপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মতিউর রহমান খান জানান, সাম্প্রতিক সময়ে জেলা প্রশাসন থেকে এমন কোনো গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
উল্লেখ্য, ২০০৪ সালে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির অধীনে স্থানীয় সাধারণ মানুষকে উপকারভোগী হিসেবে সম্পৃক্ত করে সুনামগঞ্জ-সাচনা সড়কের দুই পাশে প্রায় ২০ হাজার বৃক্ষরোপণ করা হয়েছিল। এর আগে ২০২৪ সালেও একবার বন বিভাগ এসব গাছ কাটার উদ্যোগ নিলে তীব্র গণপ্রতিবাদের মুখে পিছু হটতে বাধ্য হয়।
সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুর রহমান জানান, নিয়ম অনুযায়ী সামাজিক বনায়নের ১০ বছর পূর্ণ হলে গাছ কেটে সদস্যদের লভ্যাংশ বুঝিয়ে দেওয়া এবং পুনরায় নতুন গাছ লাগানো বিধিসম্মত। তবে বন সংরক্ষণ আইন, ২০২৬ ও উচ্চ আদালতের নির্দেশের বিষয়ে তিনি জানান, সরকারি কোনো চূড়ান্ত নির্দেশনা বা গেজেট হাতে পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি চুক্তির বাইরে থাকা দেশীয় প্রজাতির গাছগুলো না কাটার আশ্বাস প্রদান করেন এই বন কর্মকর্তা।









