জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

রংপুরে একই পরিবারের চারজন হত্যা, আটক দুই যুবক

রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার ঘটনায় দুই স্থানীয় যুবককে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আটক ব্যক্তিরা হলেন মুগ্ধ দাস ও সিদ্ধার্থ দাস। রোববার ২৩ আগস্ট দুপুরে রংপুর মহানগর পুলিশের পক্ষ থেকে সংবাদ সম্মেলনে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়। পুলিশ বলছে, প্রাথমিক তদন্তে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে আদালতে দোষ প্রমাণের আগে আটক ব্যক্তিদের অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না।

নিহত চারজন হলেন রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তাঁর স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী, মেয়ে আগামী চক্রবর্তী এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী। গণপতির বয়স ৬৫ বছর, প্রীতিলতার ৫০ বছর। তাঁদের মেয়ে আগামী সম্প্রতি স্নাতকোত্তর পরীক্ষা শেষ করেছিলেন। ছোট ছেলে আয়ুশ ছিল স্কুলের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী।

শনিবার ২২ আগস্ট রাতে নগরীর মাছুয়াপাড়ার নিজ বাড়ি থেকে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। বাড়ির ভেতর থেকে পচা দুর্গন্ধ বের হওয়ায় বিষয়টি স্থানীয়দের নজরে আসে। পরে খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তালাবদ্ধ বাড়ির ভেতর থেকে মরদেহগুলো উদ্ধার করে। বাড়ির বিভিন্ন স্থানে মরদেহ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। গণপতি চক্রবর্তীর মরদেহ পাওয়া যায় ছাদে। তাঁর স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ ছিল সিঁড়ির কাছে। আর ছেলে আয়ুশের মরদেহ পাওয়া যায় শোবার ঘরের খাটের নিচে।

পরে ময়নাতদন্তের জন্য চারটি মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পুলিশের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে চারজনকেই শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হয়। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর মৃত্যুর ধরন ও সময় সম্পর্কে আরও নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যাবে।

তদন্তের শুরুতেই বাড়িটির অস্বাভাবিক পরিস্থিতি পুলিশের নজরে আসে। বাড়ির বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন ছিল। একই সঙ্গে বিভিন্ন কক্ষের আসবাবপত্র এলোমেলো অবস্থায় পাওয়া যায় এবং টাকা-পয়সা ও স্বর্ণালংকার রাখার স্থানেও তল্লাশির চিহ্ন দেখা যায়। ফলে প্রথম দিকে ডাকাতির উদ্দেশ্যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে কি না, তা গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছিল।

তবে তদন্ত এগোনোর সঙ্গে সঙ্গে ঘটনার পেছনে অন্য কোনো কারণ ছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে বাড়ির ছাদে মাদক সেবনের আলামত পাওয়ার তথ্যও উঠে এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে, আটক দুই যুবকের জিজ্ঞাসাবাদ ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণ করে হত্যাকাণ্ডের পেছনের প্রকৃত কারণ জানার চেষ্টা চলছে।

পুলিশের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সঙ্গে ঘটনাটির যোগসূত্র থাকার প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ঘটনার আগে ও পরে অভিযুক্তদের চলাফেরা, বাড়িতে প্রবেশের পথ এবং ঘটনাস্থলে তাদের উপস্থিতির সম্ভাব্য আলামত যাচাই করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে লুটপাটের বিষয়টি কতটা যুক্ত, সেটিও তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা শুরু হওয়ার পর সন্দেহভাজনদের একজন পালিয়ে পাশের রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগান এলাকায় আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। পরে তুতবাগানের পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়। অপর যুবককেও স্থানীয় এলাকা থেকে আটক করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের সময়কার গতিবিধি ও সম্ভাব্য সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য নেওয়া হচ্ছে।

ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ ও অপরাধস্থল বিশ্লেষণকারী দল। রংপুর মহানগর পুলিশ, গোয়েন্দা বিভাগসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক ইউনিট তদন্তে যুক্ত রয়েছে। বাড়িতে প্রবেশের সম্ভাব্য পথ, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়, মূল্যবান সামগ্রী খোয়া গেছে কি না, হত্যার সময় পরিবারের সদস্যরা কোথায় ছিলেন এবং সন্দেহভাজনদের সঙ্গে নিহতদের পূর্বপরিচয় ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হচ্ছে।

গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসর নেন। অবসরের পর তিনি নিজ বাড়িতে হোমিওপ্যাথিক চিকিৎসার চেম্বার পরিচালনা করতেন। তাঁর মেয়ে আগামী চক্রবর্তী উচ্চশিক্ষা শেষ করে নতুন করে কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। আর ছোট ছেলে আয়ুশ ছিল শিক্ষার্থী। ফলে একই পরিবারের চার সদস্যের এমন মৃত্যু এলাকায় ব্যাপক শোক ও আতঙ্ক তৈরি করেছে।

পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ জানিয়েছেন, প্রাথমিক তদন্তে ঘটনাটির সঙ্গে স্থানীয় কয়েকজন যুবকের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। আটক দুই যুবককে জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামত যাচাই করে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

এদিকে নিহত পরিবারের স্বজনদের পক্ষ থেকে ঘটনাটিকে শুধু ডাকাতি হিসেবে দেখার বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ফলে তদন্তকারীদের সামনে এখন দুটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে—হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য কী এবং বাড়িতে থাকা সম্পদ লুটের ঘটনা এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল কি না। তদন্তে নতুন তথ্য বেরিয়ে এলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র আরও পরিষ্কার হবে।

মাছুয়াপাড়ার এই চার হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন, কেন একটি পরিবারের চার সদস্যকে একসঙ্গে হত্যা করা হলো। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন, ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা আলামত, সন্দেহভাজনদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের চলাফেরার তথ্য মিলিয়ে সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। আটক দুই যুবকের বিরুদ্ধে অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতাও তদন্ত ও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।

Tags :

বাংলা ডেস্ক । GLive24.com

সর্বশেষ খবর