ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বর্ণাঢ্য ফুটবল ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায় কি শুরু হয়ে গেছে? পর্তুগিজ এই মহাতারকার সাম্প্রতিক মন্তব্যে সেই সম্ভাবনাই আরও জোরালো হয়েছে। ৪১ বছর বয়সী রোনালদো জানিয়েছেন, চলতি মৌসুমই হতে পারে তার পেশাদার ফুটবল জীবনের শেষ মৌসুম। এতদিন অবসরের কথা বললেও নির্দিষ্ট সময় জানাননি তিনি। এবার প্রথমবারের মতো সময়ের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিলেন পাঁচবারের ব্যালন ডি’অরজয়ী এই ফরোয়ার্ড।
রোববার প্রকাশিত ভোগ ম্যাগাজিনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোনালদো বলেন, ‘সম্ভবত এটাই আমার ফুটবল জীবনের শেষ বছর, আর আমি একটি দুর্দান্ত উত্তরাধিকার রেখে যেতে চাই।’ তার এই বক্তব্যের পর থেকেই ফুটবল বিশ্বে তার অবসর নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
আল নাসরের সঙ্গে রোনালদোর বর্তমান চুক্তির মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। অর্থাৎ চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই তিনি মাঠ ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। তবে তিনি চলতি মৌসুম বলতে ঠিক কোন সময়কে বোঝাচ্ছেন, সেটি সাক্ষাৎকারে বিস্তারিতভাবে পরিষ্কার করেননি। ফলে তার অবসরের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো অনিশ্চিত।
গত নভেম্বরেও রোনালদো জানিয়েছিলেন, তিনি হয়তো আরও এক বা দুই বছর খেলতে পারেন। একই সময়ে তিনি বলেছিলেন, ২০২৬ সালের বিশ্বকাপই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। এবারের বিশ্বকাপে পর্তুগাল শেষ ষোলো থেকে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নেয়। রোনালদো সেই প্রতিযোগিতায় তিনটি গোল করেছিলেন। তবে বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরও তিনি অবসরের নির্দিষ্ট সময় ঘোষণা করেননি।
এবারের সাক্ষাৎকারে অবশ্য শুধু মাঠ ছাড়ার সম্ভাবনার কথাই বলেননি রোনালদো। ফুটবল-পরবর্তী জীবন নিয়েও যে তিনি ভাবতে শুরু করেছেন, সেটিও স্পষ্ট করেছেন। দীর্ঘ ক্যারিয়ারের পর পরিবারকে আরও বেশি সময় দেওয়ার পাশাপাশি নিজের পছন্দের বিভিন্ন কাজে সময় কাটানোর পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রোনালদোর ভাষ্য অনুযায়ী, ফুটবল ছাড়ার পর তার জীবনে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হতে পারে। তাই সেই পরিবর্তনের জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বেশি ভ্রমণ করা, পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, প্যাডেল খেলা এবং উপভোগ করার মতো নানা পরিকল্পনা রয়েছে তার। প্রায় ২৫ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে করা ত্যাগের পর অর্জনগুলো উপভোগ করার কথাও বলেছেন তিনি।
রোনালদোর এই মন্তব্য এসেছে তার দীর্ঘদিনের সঙ্গী জর্জিনা রদ্রিগেজের সঙ্গে বিয়ের মাত্র পাঁচ দিন আগে। পর্তুগালের কাসকাইসে অনুষ্ঠিত সেই বিয়েকে ঘিরেও ব্যাপক আগ্রহ ছিল। ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ এই অধ্যায়ের পাশাপাশি ফুটবল ক্যারিয়ারের সম্ভাব্য সমাপ্তির ইঙ্গিত রোনালদোর বর্তমান সময়কে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
রোনালদোর অবসরের আলোচনা এমন সময়ে সামনে এসেছে, যখন তার দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী লিওনেল মেসিও নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা বলেছেন। বাবার মৃত্যুর পর মেসি জানিয়েছেন, তিনি আর কতদিন খেলবেন তা নিশ্চিতভাবে জানেন না। ফলে আধুনিক ফুটবলের দুই কিংবদন্তির ক্যারিয়ারের শেষ পর্যায় নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে আবেগ তৈরি হয়েছে।
রোনালদোর ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল স্পোর্টিং লিসবনে। এরপর তিনি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, রিয়াল মাদ্রিদ ও ইউভেন্তুসের মতো ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলোর হয়ে খেলেছেন। ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে তিনি সৌদি আরবের আল নাসরের হয়ে মাঠে নামছেন।
রিয়াল মাদ্রিদে কাটানো নয় বছর ছিল তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায়গুলোর একটি। ক্লাবটির হয়ে ৪৩৮ ম্যাচে ৪৫০ গোল করেছেন তিনি, যা এখনো রিয়াল মাদ্রিদের ক্লাব ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড। ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের হয়েও দুই দফায় গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য পেয়েছেন তিনি। ইউভেন্তুসেও নিজের গোল করার ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছিলেন।
পর্তুগাল জাতীয় দলের হয়েও রোনালদোর অর্জন অসাধারণ। ইউরোপীয় ফুটবলের অন্যতম সফল এই তারকা দীর্ঘ সময় ধরে দেশের আক্রমণভাগের প্রধান মুখ ছিলেন। জাতীয় দলের হয়ে অসংখ্য গোল করার পাশাপাশি বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
এখন তার সামনে রয়েছে ক্যারিয়ারের শেষ সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। আল নাসরের সঙ্গে চুক্তি থাকলেও মাঠে থাকার ইচ্ছা, শারীরিক সক্ষমতা এবং ব্যক্তিগত জীবনের পরিকল্পনা—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেবেন রোনালদো। তবে তার সাম্প্রতিক মন্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—ফুটবল থেকে বিদায়ের চিন্তা এখন আর দূরের কোনো বিষয় নয়। বরং ইতিহাসের অন্যতম সফল ফুটবলারের ক্যারিয়ারের শেষ বাঁশি হয়তো খুব বেশি দূরে নেই।









