রাজধানী ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকার ফুটপাত ও রাজপথে ব্যবসা পরিচালনায় শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রথমবারের মতো সমন্বিত নিবন্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে ডিএসসিসি আওতাধীন এলাকায় ইচ্ছামতো স্থান দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ থাকছে না। নির্ধারিত স্থান ও সময়সূচি মেনে পথচারীদের চলাচলে বিঘ্ন না ঘটিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করতে হবে। নগর ভবনে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় হকার প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে প্রস্তাবিত হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম।
প্রশাসক স্পষ্ট জানান যে, হকারদের জীবন-জীবিকা ও কর্মসংস্থান সুরক্ষার পাশাপাশি সাধারণ নগরবাসীর নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করা, যানজট কমানো এবং একটি নিরাপদ, পথচারীবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব নগরী গড়ে তোলাই এই নীতিমালার প্রধান উদ্দেশ্য।
ডিজিটাল লাইসেন্স ও ফি কাঠামো
প্রস্তাবিত নীতিমালা অনুযায়ী, যোগ্য আবেদনকারীদের কিউআর কোড ও বারকোডযুক্ত স্মার্ট কার্ড বা পরিচয়পত্র দেওয়া হবে। এতে বারকোড ব্যবস্থা থাকায় ট্রাফিক পুলিশ কিংবা সিটি কর্পোরেশনের তদারকি দল সহজেই হকারের পরিচয় ও বরাদ্দের বৈধতা যাচাই করতে পারবে। নিবন্ধিত হকারদের লাইসেন্স সম্পূর্ণ অ-হস্তান্তরযোগ্য এবং পরিবারের কেবল একজন সদস্য একটিই লাইসেন্স পাবেন। আবেদনকারীর বয়স কমপক্ষে ১৮ বছর এবং তাকে বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে। লাইসেন্স পাওয়ার পর কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ব্যবসার ধরন বা স্টলের আকার কোনোভাবে পরিবর্তন করা যাবে না।
নিবন্ধন ও পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট ফি প্রস্তাব করা হয়েছে:
এককালীন নিবন্ধন ফি: ৫,০০০ টাকা
বার্ষিক নবায়ন ফি: ২, ৫০০ টাকা
মাসিক ব্যবস্থাপনা ফি: ৩,০০০ টাকা (পরিচ্ছন্নতা, সার্বিক রক্ষণাবেক্ষণ ও স্থান ব্যবহারের জন্য)
স্থান নির্বাচন ও চাঁদাবাজিমুক্ত পরিবেশের আশ্বাস
নীতিমালায় পথচারীদের অধিকারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। যেকোনো ফুটপাতে হকার বসানোর পর পথচারীদের চলাচলের জন্য কমপক্ষে ৫ থেকে ৬ ফুট চওড়া জায়গা ফাঁকা রাখা বাধ্যতামূলক। প্রধান সড়ক, মেট্রো রেল স্টেশন, বাসস্টপ, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মোড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, উপাসনালয় কিংবা কবরস্থান সংলগ্ন এলাকায় হকার বসা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে নিবন্ধিত হকারদের জন্য বরাদ্দ করা স্থান অন্য কেউ দখল করতে পারবে না এবং কোনো প্রভাবশালী চক্র যেন চাঁদা দাবি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করবে সিটি কর্পোরেশন।
হলিডে ও নৈশকালীন মার্কেট চালুর রূপরেখা
যানজট এড়িয়ে বেচাকেনা সচল রাখতে ছুটির দিনে বিশেষ ‘হলিডে মার্কেট’ এবং কর্মব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকায় অফিস সময়ের পর ‘নৈশকালীন মার্কেট’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব বাজারে নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। বিশেষ করে খাবার বিক্রেতাদের ক্ষেত্রে কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা বাধ্য করা হচ্ছে। পুরো প্রক্রিয়া সচল ও স্বচ্ছ রাখতে নোটিশ বোর্ড ও ওয়েবসাইটে নিবন্ধিত হকারদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য প্রকাশ করা হবে।
হকার নেতাদের দাবি ও প্রতিক্রিয়া
মতবিনিময় সভায় হকার সংগঠনের প্রতিনিধিরা সার্বিক শৃঙ্খলা আনার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও প্রস্তাবিত এককালীন ও মাসিক ফি সাধারণ হকারদের সাধ্যের বাইরে বলে তা কমানোর জোর দাবি জানান। বিশেষ করে পুরান ঢাকা ও জুরাইন অঞ্চলের স্থায়ী হকারদের উপযুক্ত স্থানে পুনর্বাসন এবং সংকীর্ণ ফুটপাতের জন্য বাস্তবসম্মত নিয়ম প্রণয়নের তাগিদ দেন তারা। ডিএসসিসি প্রশাসক প্রতিনিধিদের যুক্তি শোনেন এবং সবার স্বার্থ রক্ষা করে একটি মানবিক ও কার্যকর চূড়ান্ত নীতিমালা প্রণয়নের আশ্বাস দেন।









