শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার জয়নগর ইউনিয়নে একটি ১২ বছর বয়সী শিশুকে বলাৎকারের মতো গুরুতর অপরাধ ঘটার পর তা স্থানীয় মাতব্বরদের প্রভাবে সালিশের মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এই ন্যক্কারজনক ঘটনার পর স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও জামায়াত নেতার নেতৃত্বে টাকার অঙ্কে বিচারকার্যকে পাশ কাটানোর চেষ্টা করা হয়, যা আইনের শাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
ঘটনার বিবরণ অনুযায়ী, গত বৃহস্পতিবার রাতে জয়নগর আয়তুন্নেছা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলায় নিয়ে ওই শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে পাশবিক নির্যাতন চালান ইলিয়াস খান নামের পঞ্চাশ বছর বয়সী এক ব্যক্তি। বিদ্যালয়ের মতো একটি পবিত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এ ধরনের পৈশাচিক ঘটনা ঘটার কারণে এলাকায় চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অসহায় পরিবারটি শুরুতে বিচার পাওয়ার আকুতি জানালেও স্থানীয় প্রভাবশালীচক্রের চাপে কুলিয়ে উঠতে পারেনি।
পরবর্তীতে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার লক্ষ্যে স্থানীয় জামায়াত নেতা মাওলানা মো. সেলিম এবং মান্নান শিকদারের নেতৃত্বে বেশ কয়েক দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ভুক্তভোগীর পরিবার প্রথমদিকে সামাজিক হেনস্থা ও ভয়ের কারণে চুপ থাকলেও অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হয়। শেষ পর্যন্ত গত বুধবার সন্ধ্যায় স্থানীয় জয়নগর মোসলেম উদ্দিন খান ডিগ্রি কলেজ মাঠে একটি সালিশ বৈঠক বসে। সেখানে এলাকার কিছু গণ্যমান্য মাতব্বর ও আত্মীয়স্বজনের প্রত্যক্ষ চাপে মাত্র এক লাখ টাকার বিনিময়ে মামলা না করার শর্তে শিশুর বাবার কাছ থেকে জোরপূর্বক লিখিত স্বাক্ষর আদায় করা হয়। ভুক্তভোগী শিশুর বাবা গণমাধ্যমের কাছে অসহায়ত্বের কথা স্বীকার করে জানান যে, তিনি প্রথমে আপসে রাজি না থাকলেও সামাজিক চাপে বাধ্য হয়ে স্বাক্ষর দিয়েছেন।
শিশুর ওপর এ ধরনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর তা অর্থের বিনিময়ে রফা-দফা করায় এলাকার সচেতন নাগরিক সমাজের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সমাজবিশ্লেষকদের মতে, ফৌজদারি অপরাধ কখনো সালিশের মাধ্যমে মীমাংসা করা যায় না। এ ধরনের অপসংস্কৃতি অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তোলে এবং সমাজে অপরাধপ্রবণতা বাড়িয়ে দেয়।
অভিযুক্তদের ভূমিকা নিয়ে সংবাদমাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য উঠে এসেছে। এ বিষয়ে জামায়াত নেতা মাওলানা মো. সেলিম নিজের দায় এড়িয়ে দাবি করেছেন যে তিনি একা নন, বরং এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে সালিশের অপর অন্যতম আয়োজক মান্নান শিকদারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে বাড়িতে পাওয়া যায়নি।
ঘটনাটি সম্পর্কে জাজিরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সালেহ আহমেদ জানান যে থানায় সরাসরি কোনো লিখিত অভিযোগ পৌঁছায়নি। তবে বিভিন্ন মাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে বিষয়টি পুলিশের নজরে আসার সঙ্গে সঙ্গেই ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছে। পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে পুরো ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং তদন্তে সত্যতা প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।









