মাদারীপুরের শিবচর উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ নদের তীব্র স্রোতে আবারও মারাত্মক ভাঙন দেখা দিয়েছে। সোমবার সকাল থেকে উপজেলার বহেরাতলা-কলাতলা পয়েন্টে নদীভাঙন শুরু হয়। নদের পানি হু-হু করে বাড়ার সাথে সাথে ভাঙনের ভয়াবহতা দ্রুত রূপ নেয়। চোখের পলকেই বহেরাতলা-কলাতলা বেড়িবাঁধের একটি বড় অংশ নদের পেটে চলে যায়। একই সাথে বহেরাতলা বাজার থেকে কলাতলা গ্রামের দিকে যাওয়ার একমাত্র পাকা সড়কটির কিছু অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে পুরো এলাকাটিতে তীব্র আতঙ্ক ও মানবিক অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
হঠাৎ শুরু হওয়া এই ভাঙনে বহেরাতলা ও কলাতলাসহ পার্শ্ববর্তী কয়েকটি গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। নদীর এই বিধ্বংসী রূপ অব্যাহত থাকলে কলাতলা গ্রামের সাথে বহেরাতলা বাজারের সরাসরি যানবাহন চলাচল এবং আঞ্চলিক সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, এই সড়ক দিয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। কলাতলা ও আশপাশের গ্রামগুলোর মানুষের চলাচলের জন্য এটিই একমাত্র পথ। প্রতিদিনের নিত্যপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা, হাটবাজার, স্থানীয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাতায়াত এবং জরুরি রোগীদের হাসপাতালে নেওয়ার একমাত্র ভরসা এই রাস্তাটি। সড়কটি ভেঙে যাওয়ায় শিক্ষার্থী, রোগী ও ব্যবসায়ীদের ভোগান্তি এখন চরমে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, নদের তীর থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরত্বে অবস্থিত বহেরাতলা দক্ষিণ ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের স্থায়ী ভোটকেন্দ্রটি। ভাঙনের গতি না থামলে যেকোনো মুহূর্তে এ সরকারি স্থাপনাটিও নদীতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘ এক দশক ধরে তারা এই আড়িয়াল খাঁ নদের করাল গ্রাসে নিঃস্ব হচ্ছেন। পাউবোর সুরক্ষামূলক উদ্যোগে বেড়িবাঁধ নির্মাণের পর তারা ভেবেছিলেন হয়তো দীর্ঘদিনের দুর্যোগ কেটে গেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ড্রেজার ব্যবসায়ীদের সীমাহীন লোভ ও অপরিকল্পিত নদী খননের কারণে আবারো ভয়াবহ দুর্যোগ নেমে এসেছে। রাতের আঁধারে আড়িয়াল খাঁ নদ থেকে অবৈধ ড্রেজার বসিয়ে অবাধে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে, যার ফলে পানির প্রবাহ বিঘ্নিত হয়ে পাড়ে প্রচণ্ড ঘূর্ণিস্রোত তৈরি হচ্ছে।
বহেরাতলা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা নওয়াব মাদবর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “প্রায় ১০ বছর ধরে আমরা নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারাচ্ছি। বেড়িবাঁধ হওয়ার পর মনে হয়েছিল একটু সুখে শান্তিতে বাস করব। কিন্তু অসাধু বালু ব্যবসায়ীদের রাতে ড্রেজার দিয়ে বালু কাটার কারণে আজ আবারও সব ধ্বংসের পথে। দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা না নিলে আমাদের ঘরবাড়িও থাকবে না।” একই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কালাম মাদবরসহ অন্যান্য বাসিন্দারাও।
পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনা করে এলাকাবাসী অবিলম্বে নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ, আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনকবলিত তীরে দ্রুত জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িক ধস রোধ এবং ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ ও সড়কটি জরুরি ভিত্তিতে মেরামতের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে শিবচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এইচ এম ইবনে মিজান জানান, বহেরাতলা-কলাতলা পয়েন্টে আড়িয়াল খাঁ নদের ভাঙনের তীব্রতার খবর তারা পেয়েছেন এবং প্রশাসন বিষয়টি গুরুত্বের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডকে (পাউবো) তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই ভাঙন ঠেকাতে ও বেড়িবাঁধ রক্ষায় পাউবো নদীর তীরে জিও ব্যাগ ফেলাসহ কার্যকর পদক্ষেপ শুরু করবে। পাশাপাশি নদে যেকোনো ধরনের অবৈধ ড্রেজার পরিচালনা বন্ধে প্রশাসনিক মোবাইল কোর্ট অভিযান জোরদার করা হবে।









