গান গাওয়ার স্বতন্ত্র ঢং, দৃষ্টিনন্দন পোশাক, উন্মাদনাময় নাচ আর অনন্য তারকাসংস্কৃতি দিয়ে বিশ্ববাসীকে আচ্ছন্ন করেছিলেন এলভিস প্রিসলি। আজ ১৬ আগস্ট, সংগীতজগতের এই প্রবাদপুরুষের ৪৯তম মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৭৭ সালের এই দিনে মাত্র ৪২ বছর বয়সে কোটি কোটি ভক্তকে কাঁদিয়ে বিদায় নেন ‘দ্য কিং’। অকালপ্রয়াণের প্রায় পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও পপ সংস্কৃতিতে তাঁর প্রভাব এখনো অটুট। কিন্তু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এত জনপ্রিয়তা থাকা সত্ত্বেও তিনি কেন উত্তর আমেরিকার বাইরে কনসার্ট করেননি, তা সংগীতাঙ্গনে এক বড় আলোচনার বিষয়।
ষাটের দশকে পপ ও রক সংগীতের জোয়ারের সময় ইউরোপ, এশিয়া বা অস্ট্রেলিয়ার প্রমোটাররা এলভিসকে নিজ দেশে নেওয়ার জন্য মুখিয়ে ছিলেন। তবে বিপুল চাহিদা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে তাঁর গান খুব একটা পৌঁছায়নি। পুরো ক্যারিয়ারে ২৪০টির বেশি শহরে ১,৬০০টিরও বেশি একক কনসার্ট করলেও যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে প্রিসলির লাইভ শো হয়েছিল মাত্র পাঁচটি, যা অনুষ্ঠিত হয় প্রতিবেশী দেশ কানাডায়। ১৯৫৭ সালে টরন্টো, অটোয়া ও ভ্যাঙ্কুভারে হয় সেসব কনসার্ট। সংগীতের বাইরে কেবল আমেরিকান সেনাবাহিনীতে চাকরির সুবাদে স্কটল্যান্ড ও ফ্রান্স হয়ে পশ্চিম জার্মানিতে কিছুকাল অবস্থান করার সুযোগ পান তিনি।
অথবা বলা ভালো, প্রিসলিকে আন্তর্জাতিক সফরে যাওয়ার সুযোগটি দেওয়া হয়নি। সমসাময়িক তারকা—যেমন লিটল রিচার্ড, বিল হ্যালি, জেরি লি লুইস কিংবা বাডি হলি—ততদিনে আটলান্টিক পেরিয়ে বিশ্বভ্রমণ সম্পন্ন করেছিলেন। প্রিসলির নিজেরও বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া ও জাপানে গিয়ে গান গাওয়ার তীব্র ইচ্ছা ছিল। কিন্তু তাঁর সেই ইচ্ছার পথে মূল বাধা ছিলেন প্রতাপশালী ম্যানেজার ‘কর্নেল’ টম পার্কার।
প্রিসলির ক্যারিয়ারের শুরু থেকে জীবনাবসান পর্যন্ত সার্বিক নিয়ন্ত্রক ছিলেন এই পার্কার। এমনকি গায়কের সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়া থেকে শুরু করে বিয়ে—সবকিছুই ছিল পার্কারের ব্যবসায়িক কৌশলের অংশ। এর বিনিময়ে প্রিসলির উপার্জনের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত তিনি নিতেন। বিশ্বস্ত সহযোগী জেরি শিলিং জানান, লাস ভেগাসে এক বৈঠকে প্রিসলি বিদেশে শো করার ইচ্ছা প্রকাশ করলে পার্কার সাফ জানিয়ে দেন, ‘তুমি গেলে আমি যাব না।’ ক্ষুব্ধ এলভিস তাঁকে বরখাস্ত করতে চাইলেও সংগীতাঙ্গনে পার্কারের ক্ষমতার কারণে তা সম্ভব হয়নি।
কিন্তু কেন এলভিসকে আটকে রেখেছিলেন পার্কার? কেনই বা ১৯৭৫ সালে দক্ষিণ আমেরিকা বা সৌদি আরবের মিলিয়ন ডলারের প্রস্তাব তিনি ফিরিয়ে দেন? মূল রহস্য লুকিয়ে ছিল পার্কারের অতীত পরিচয়ে।
পার্কার নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে দাবি করলেও বাস্তবে তিনি ছিলেন ১৯০৯ সালে নেদারল্যান্ডসের ব্রেদায় জন্মগ্রহণকারী ডাচ নাগরিক আন্দ্রেয়াস কর্নেলিস ভ্যান কুইক। ১৯২৯ সালে ভুয়া নথিপত্র ব্যবহার করে অবৈধভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের পর তিনি কখনোই মার্কিন নাগরিকত্ব পাননি।
পার্কারের এই আইনি জটিলতাই এলভিসের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার থমকে যাওয়ার অন্যতম কারণ। পাসপোর্ট নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে গেলে ফেরার সময় নথি পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হতো, যা তাঁর অবৈধ অনুপ্রবেশ ফাঁস করে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করত। অন্যদিকে সে সময় কানাডা পারাপারে পাসপোর্টের কড়াকড়ি না থাকায় কেবল সেখানেই গায়ককে নিয়ে যাওয়ার সাহস দেখান তিনি। ম্যানেজারের এই ব্যক্তিগত ভয়ের কারণেই শেষ পর্যন্ত বিশ্বমঞ্চে নিজের সৃজনশীলতা ছড়ানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত থেকে যান রক অ্যান্ড রোলের এই রাজা।









