সারাদেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে উৎপাদনমুখী শিল্প খাত। নিত্যপণ্য, ওষুধ, সিরামিক, ইস্পাত, টেক্সটাইলসহ বিভিন্ন খাতের ছোট-বড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে। আরও দেড় শতাধিক কারখানায় উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকেরও নিচে। ফলে দেশের নিত্যপণ্যের বাজার ও রপ্তানিমুখী শিল্প চরম ঝুঁকিতে পড়েছে।
শিল্পমালিকদের সূত্রে জানা গেছে, প্রায় এক মাস ধরে দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকট চলছে, যা গত সপ্তাহে ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, সাভার, গাজীপুর, চট্টগ্রাম, হবিগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও খুলনা অঞ্চলের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক কারখানায় বয়লার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী জেনারেটর চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
গ্যাস ও বিদ্যুৎ-সংকটে দেশের নিত্যপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক। নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে চিনি, গম, ভোজ্যতেল ও ডাল প্রক্রিয়াজাতকরণের শতাধিক কারখানার মধ্যে প্রায় অর্ধেকই সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টিরই উৎপাদন বন্ধ রাখতে হয়েছে। টি কে গ্রুপের ঢাকার আশপাশের গ্যাসনির্ভর প্রায় সবকটি কারখানা এবং এসিআই লিমিটেডের বিভিন্ন ইউনিটে উৎপাদন ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে।
উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে পাইকারি বাজারগুলোতে। নারায়ণগঞ্জের নিতাইগঞ্জে সরবরাহের ঘাটতির কারণে তিন দিনে চিনির কোনো ট্রাক ঢোকেনি, ফলে বাজারে কেজিতে ৭ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের মতো শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলো এডিবল অয়েল ও আটা-ময়দার উৎপাদন সংকুচিত করতে বাধ্য হয়েছে। সাময়িক বাজার ঘাটতি এড়াতে অনেক প্রতিষ্ঠান বাধ্য হয়ে গুদামে থাকা মজুত থেকে “রেশনিং” পদ্ধতিতে পণ্য সরবরাহ করছে।
একই অবস্থা অন্যান্য জরুরি ও রপ্তানিমুখী শিল্পগুলোতেও। আরএকে সিরামিকসের উৎপাদন পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ও বিএসআরএমের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ে বিকল্প জ্বালানি ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত পরিসরে উৎপাদন চালু রেখেছে। নরসিংদীতে স্থানীয় টেক্সটাইল খাতের ৯০ শতাংশ কারখানাই বন্ধের পথে এবং খুলনায় হিমায়িত চিংড়ি প্রক্রিয়াজাতকরণে খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
বাংলাদেশ তেল, গ্যাস, খনিজ সম্পদ করপোরেশনের (পেট্রোবাংলা) তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা ৩৮০ কোটি ঘনফুট। অতি সম্প্রতি এলএনজি টার্মিনালগুলো সাময়িকভাবে অচল হয়ে পড়ায় সরবরাহ ১৭৩ কোটি ঘনফুটে নেমে আসে। তবে পরবর্তীতে সামিট ও এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল থেকে সরবরাহ কিছুটা শুরু হওয়ায় তা ২৪৪ কোটি ঘনফুটে উন্নীত হয়। তা সত্ত্বেও বর্তমানে দিনে অন্তত ২৬ কোটি ঘনফুট গ্যাসের তীব্র ঘাটতি রয়ে গেছে। ব্যবসায়ী নেতারা সতর্ক করেছেন, দ্রুত এই জ্বালানি সমস্যার সমাধান না হলে বাজারে পণ্যের চরম ঘাটতি দেখা দেবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশের রপ্তানি প্রতিযোগিতা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
সংকটের সার্বিক প্রভাব ও ব্যবসায়িক খাতের চিত্র নিচে সারণির মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিভাগ/খাত | সংশ্লিষ্ট এলাকা/প্রতিষ্ঠান | সংকটের ধরণ ও বর্তমান পরিস্থিতি |
| নিত্যপণ্য (এমজিআই) | ঢাকা ও চট্টগ্রাম অঞ্চল | ৫৭টি কারখানার মধ্যে ৪০টি পুরোপুরি বন্ধ। |
| নিত্যপণ্য (টি কে গ্রুপ) | ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও উত্তরাঞ্চল | ঢাকার পাশের প্রায় সব কারখানা বন্ধ, বিদ্যুৎ সংকটে দিনে ৮-১০ বার লোডশেডিং। |
| নিত্যপণ্য ও ওষুধ (এসিআই) | রূপগঞ্জ, বন্দর, গাজীপুর | লবণ, আটা-ময়দা ও ওষুধের উৎপাদন ৩০-৫০% হ্রাস। |
| ভোজ্যতেল ও খাদ্য (সিটি গ্রুপ) | রূপসী, রূপগঞ্জ | উৎপাদন ৮০% হ্রাস; একটি প্ল্যান্ট বন্ধ রেখে অন্যটি চালুর চেষ্টা। |
| সিরামিক (আরএকে) | গাজীপুর/সংশ্লিষ্ট অঞ্চল | গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি না থাকায় উৎপাদন সম্পূর্ণ বন্ধ। |
| ইস্পাত (বিএসআরএম) | চট্টগ্রাম ও অন্যান্য | গ্যাস বন্ধ; ডিজেল ব্যবহার করে অর্ধেকের কম সক্ষমতায় উৎপাদন চালু। |
| ওষুধ (স্কয়ার ফার্মা) | পাবনা ও কালিয়াকৈর | জরুরি উৎপাদন সচল রাখতে ব্যয়বহুল ডিজেল ব্যবহার করা হচ্ছে। |
| টেক্সটাইল ও ডাইং | নরসিংদী জেলা | ৯০% কারখানা বন্ধ; গড় উৎপাদন ১০ শতাংশে নেমে এসেছে। |
| মৎস্য ও হিমাগার | খুলনা অঞ্চল | ভরা মৌসুমে বিদ্যুতের অভাবে জেনারেটর চালিয়ে অতিরিক্ত খরচে মাছ সংরক্ষণ। |
| ইপিজেড ও রপ্তানি | চট্টগ্রাম ইপিজেড | বিদ্যুতের জন্য প্রয়োজনীয় ১৮ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের জায়গায় পাচ্ছে অর্ধেকেরও কম। |









